সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই আগস্ট ২০২৬, ১০:০ পিএম

বিশ্ব সংগীতের দীর্ঘ ইতিহাসে বহুল আলোচিত অনেক তারকার জন্ম হয়েছে, আবার সময়ের বিবর্তনে তাঁদের অনেকে স্মৃতি থেকেও মুছে গেছেন। কিন্তু কিছু শিল্পী যুগের সীমা পেরিয়ে এমন এক চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হন, যাঁদের প্রভাব কখনো স্তিমিত হয় না। ১৯৭৭ সালের ১৬ আগস্ট মাত্র ৪২ বছর বয়সে অকালমৃত্যু ঘটেছিল মার্কিন সংগীতশিল্পী এলভিস প্রিসলির। মৃত্যুর ৪৯ বছর অতিক্রম করলেও আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে তাঁর নামের আগে বাড়তি কোনো পরিচয় যোগ করার দরকার পড়ে না—কেবল ‘এলভিস’ উচ্চারণ করলেই পুরো পৃথিবী এক নামে চিনে নেয় ‘দ্য কিং অব রক অ্যান্ড রোল’-কে।
এলভিস শুধুই একজন সফল গায়ক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন আধুনিক বৈশ্বিক পপ সংস্কৃতির এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী স্থপতি। ১৯৩৫ সালের ৮ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপির টুপেলো শহরের এক দরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ সংস্কৃতির বিচিত্র সুর শুনে বেড়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৪ সালে মেমফিসের ঐতিহাসিক সান রেকর্ডসে ‘দ্যাটস অল রাইট’ গানটি রেকর্ড করার মাধ্যমে তাঁর পেশাদার সংগীতযাত্রার সূচনা। এরপর ১৯৫৬ সালে আরসিএ মিউজিক লেবেলের অধীনে প্রকাশিত ‘হার্টব্রেক হোটেল’ দ্রুত ১০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয় এবং তাঁকে রাতারাতি বিশ্বমঞ্চের জাতীয় তারকায় পরিণত করে। কান্ট্রি, আরঅ্যান্ডবি, ব্লুজ ও গসপেল সংগীতিকে এক সুতোয় গেঁথে তিনি নতুন এক সংগীত তরঙ্গের উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিলেন।
তবে এই পর্বতসম সাফল্যের সমান্তরালে ছিল তীব্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক। ১৯৫০-এর দশকে চরম বর্ণবৈষম্যে বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের উদ্ভাবিত ব্লুজ ও আরঅ্যান্ডবি সুরকে মূলধারার শ্বেতাঙ্গ শ্রোতাদের কাছে পরিবেশন করার জন্য তাঁকে ‘সাংস্কৃতিক আত্মসাৎকারী’ হিসেবেও অভিযুক্ত করা হয়। যদিও আর্থার ক্রুডাপ, বিগ মামা থর্নটন কিংবা বি বি কিংয়ের মতো কৃষ্ণাঙ্গ সংগীত কিংবদন্তিদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও প্রকাশ্য স্বীকৃতি ইতিহাসের দলিলে পরিষ্কারভাবে লেখা রয়েছে। এসব তর্কের বাইরে গিয়েও স্বীকার করতে হয় যে, মঞ্চে নিখুঁত নাচ, আবেদনময় শরীরী ভাষা, সিগনেচার পম্পাডোর hairstyle এবং রঙিন জ্যাকেট ও ঝলমলে জাম্পস্যুট দিয়ে কীভাবে একজন কণ্ঠশিল্পীকে ভিজ্যুয়াল আইকনে রূপ দিতে হয়, এলভিসই তা প্রথম বিশ্বকে শিখিয়েছিলেন।
সংগীতের পাশাপাশি হলিউডের সেলুলয়েড পর্দায় তাঁর পদচারণা ছিল অত্যন্ত চোখে পড়ার মতো। গ্রেসল্যান্ডের দাপ্তরিক তথ্য মতে, তিনি মোট ৩১টি ফিচার চলচ্চিত্র এবং দুটি কনসার্ট ডকুমেন্টারিতে অভিনয় করেছিলেন। তবে মূলধারার ফর্মুলাভিত্তিক সিনেমার বাঁধাধরা ছকে আটকে থাকায় তাঁর আসল অভিনয় প্রতিভা ও সম্ভাবনা সেখানে শতভাগ ফুটে ওঠেনি। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালের বিখ্যাত ‘৬৮ কামব্যাক কনসার্ট’ এবং ১৯৭৩ সালে বিশ্বজুড়ে স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে সরাসরি সম্প্রচারিত ‘আলোহা ফ্রম হাওয়াই’-এর মতো ঐতিহাসিক মঞ্চ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নতুন রূপে আবিষ্কার করেন।
ব্যক্তিগত ম্যানেজার কর্নেল টম পার্কারের কঠোর ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ, অতিমাত্রায় প্রেসক্রিপশন ওষুধের ওপর নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক খ্যাতির প্রবল মানসিক চাপ শেষ বয়সে এসে এই সংগীত রাজাকে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। তা সত্ত্বেও তাঁর মৃত্যুর পর চার দশক পেরিয়েও সেই সংগীত সাম্রাজ্য থামেনি। ভিনাইল রেকর্ড, অডিও ক্যাসেট, সিডি থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল স্ট্রিমিং যুগেও তাঁর অ্যালবাম বিক্রির সংখ্যা শতকোটি ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মেমফিসে অবস্থিত তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বসতি ‘গ্রেসল্যান্ড’ আজও বিশ্বজুড়ে সংগীতপ্রেমীদের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থান। এলভিস প্রিসলি তাঁর কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন যে মানুষের নশ্বর জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও সৃষ্টিশীল রাজত্ব চিরকাল অম্লান থাকে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য