সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই এপ্রিল ২০২৬, ৪:১৩ পিএম

ধর্ম অবমাননা ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা বাউলশিল্পী আবুল সরকার ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত মামলার আইনগত ভিত্তি, অভিযোগ গঠন প্রক্রিয়ার বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ে একটি রুল জারি করেছেন। এই রুলের চূড়ান্ত শুনানির পর মামলার ভবিষ্যৎ গতি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।
হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আতোয়ার রহমান ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত রোববার এ আদেশ দেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত প্রাথমিকভাবে মনে করে, মামলার নথি ও অভিযোগ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেওয়ার মতো পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে। তবে আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করে জানায়, অন্য কোনো মামলায় আটক না থাকলে জামিনপ্রাপ্ত আসামির মুক্তিতে আইনগত বাধা থাকবে না।
আবুল সরকারের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী গাজী কামরুল ইসলাম সজল। তিনি আদালতে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, অভিযোগপত্রে ধর্ম অবমাননার কথা উল্লেখ থাকলেও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও যথেষ্ট আইনি উপাদান উপস্থাপন করা হয়নি। তার মতে, অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল এবং এটি জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতানা আক্তার রুবি। তিনি মামলার গুরুত্ব তুলে ধরে আদালতকে জানান, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগ সমাজে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। তাই বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা যাচাই করা প্রয়োজন।
আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, নিম্ন আদালতে জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর বিষয়টি উচ্চ আদালতে উপস্থাপন করা হয়। উচ্চ আদালত নথি পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে মনে করে যে, মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে অন্তর্বর্তী জামিন দেওয়া যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। একই সঙ্গে আদালত মামলার আইনগত দিকগুলো খতিয়ে দেখতে রুল জারি করে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ৪ নভেম্বর, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জাবরা এলাকায় অনুষ্ঠিত একটি লোকজ মেলা ও পালাগানের আসরকে কেন্দ্র করে। ওই আসরে আবুল সরকারের কিছু বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, তার বক্তব্য ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে এবং আপত্তিকর মন্তব্য রয়েছে, যা দ্রুত সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
পরবর্তীতে ১৯ নভেম্বর রাতে মাদারীপুরে একটি গানের আসর থেকে তাকে আটক করা হয়। পরদিন ২০ নভেম্বর আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় ঘিওর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদানের অভিযোগ আনা হয়।
ঘটনার সময়রেখা নিচে দেওয়া হলো—
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ৪ নভেম্বর | ঘিওর উপজেলার লোকজ মেলায় পালাগানের বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি |
| ১৯ নভেম্বর | মাদারীপুরে গানের আসর থেকে আটক |
| ২০ নভেম্বর | আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ |
| পরবর্তী সময় | হাইকোর্টে জামিন আবেদন দাখিল |
| রোববার | ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর |
হাইকোর্টের এই আদেশে বাউলশিল্পী আবুল সরকারের সাময়িক মুক্তির পথ উন্মুক্ত হলেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো বাকি রয়েছে। রুলের চূড়ান্ত শুনানিতে আদালত নির্ধারণ করবে অভিযোগ কতটা আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং তা বিচারিকভাবে টেকসই কি না। এদিকে এই ঘটনাকে ঘিরে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও বাউল সংগীত মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, যেখানে কেউ কেউ এটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ আইনগত প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখার কথা বলছেন।
মন্তব্য