বাংলা সঙ্গীত ও সংস্কৃতির ইতিহাসের দিকে তাকালে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষের দেখা মেলে, যাঁদের প্রতিভা কোনো একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমে বেঁধে রাখা যায় না। তেমনই এক বহুমাত্রিক ও মরমী সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন দেবু ভট্টাচার্য। সঙ্গীতাঙ্গনে তাঁর পা রাখা হয়েছিল একজন গীতিকার হিসেবে, কিন্তু পরবর্তীতে নিজের অবিশ্বাস্য মেধা দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এই উপমহাদেশের অন্যতম সেরা সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক। শুধু তা-ই নয়, তিনি ছিলেন একাধারে তুখোড় বংশীবাদক এবং একজন প্রথাগত চিত্রশিল্পী। রুনা লায়লা, মেহদী হাসান কিংবা শাহনাজ রহমতুল্লাহর মতো কিংবদন্তিদের ক্যারিয়ার গড়ার নেপথ্যের মূল কারিগর ছিলেন এই মানুষটি। দেশের সঙ্গীতজগতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।
Table of Contents
দেবু ভট্টাচার্য | বাঙালি সঙ্গীতজ্ঞ

নাম বদলের গল্প, জয়নুল আবেদীনের ক্যানভাস ও সুরের শৈশব
১৯৩০ সালের ১ আগস্ট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও সংস্কৃতিমুখর জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন দেবু ভট্টাচার্য। তবে তাঁর জন্মের আগে এই ভট্টাচার্য পরিবারটি বাস করত বাগেরহাট জেলার ফকিরপুরে। জন্মের পর দেবুর বাবা আদর করে তাঁর নাম রেখেছিলেন ‘প্রাণকুমার ভট্টাচার্য’। কিন্তু স্কুলে ভর্তি করার সময় চিরকালের জন্য তাঁর নাম নিবন্ধিত হয়ে যায় ‘দেবাদাস ভট্টাচার্য’ হিসেবে। তবে সঙ্গীত ও শিল্পের ভুবন তাঁকে চেনে শুধুই ‘দেবু ভট্টাচার্য’ নামে।
শৈশব থেকেই শিল্পের প্রতি তাঁর এক অমোঘ টান ছিল। সেই টানের সূত্র ধরেই ১৯৫০ সালে তিনি কলকাতার আর্ট স্কুল থেকে চিত্রকলা (Fine Arts) বিষয়ে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ করেন। সেখানে তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের শিল্পকলা আন্দোলনের পথিকৃৎ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনকে। পরবর্তীতে কলকাতায় অবস্থানকালেই তিনি সান্নিধ্য লাভ করেন এদেশের আরও দুই বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী—পটুয়া কামরুল হাসান এবং ওস্তাদ এস এম সুলতান-এর।
বাঁশির জাদুতে মুগ্ধতা এবং প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন
চিত্রকলা নিয়ে পড়াশোনা করলেও দেবু ভট্টাচার্যের আরেকটি সত্তা লুকিয়ে ছিল বাঁশির সাতটি ছিদ্রে। খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি বাঁশি বাজানোয় দারুণ পারদর্শী ছিলেন। ১৯৪৫ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে কিংবদন্তি উস্তাদ তিমিরবরণ পরিচালিত একটি বিখ্যাত অর্কেস্ট্রা গ্রুপে একজন সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে যোগ দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। এই অর্কেস্ট্রার আঙিনাতেই তিনি প্রথম গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৫০ সালের দিকে ভারতীয় ধ্রুপদী রাগের ওপর ভিত্তি করে বাজানো তাঁর কয়েকটি বাঁশির রেকর্ড বাজারে আসে, যা সে সময় দারুণ সমাদৃত হয়েছিল। মিউজিকের পাশাপাশি নাচ এবং নাটকের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল।
১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত তিনি ধ্রুপদী, লোকসঙ্গীত ও আধুনিক ধারার অসংখ্য গান তৈরি করেছেন। তাঁর মিউজিকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি বাংলার লোকজ ও দেশীয় সুরের সাথে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল মিউজিকের এক অপূর্ব ও নিখুঁত সমন্বয় ঘটাতে পারতেন। এছাড়া বাংলাদেশের স্বনামধন্য বহু কবির দেশপ্রেমমূলক কবিতাকে গানে রূপ দিয়ে এবং তাতে সুরারোপ করে তিনি অমর করে গেছেন। রুনা লায়লার কণ্ঠে গাওয়া সেই বিখ্যাত দেশাত্মবোধক গান—“প্রতিদিন তোমায় দেখি সূর্যের আগে” দেবু ভট্টাচার্যেরই এক কালজয়ী ও অসাধারণ সৃষ্টি।
কিংবদন্তিদের মেন্টর ও ‘মেহদী হাসান-রুনা লায়লা’র উত্থান
উপমহাদেশের সঙ্গীতজগতে দেবু ভট্টাচার্যের মস্ত বড় অবদান হলো তাঁর জহুরি চোখ। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা আর হাত ধরেই বহু বাংলাদেশী ও পাকিস্তানি শিল্পী আজ মিউজিক ওয়ার্ল্ডের চূড়ায় বসে আছেন। ১৯৬০-এর দশকে তিনি পাকিস্তানের বিখ্যাত গজল সম্রাট মেহেদী হাসান, সুরাইয়া মুলতানীকর এবং আহমেদ রুশদীর মতো শিল্পীদের দিয়ে বাংলা গান গাওয়ান।
অন্যদিকে বাঙালি শিল্পীদের মধ্যে বশির আহমেদ, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, ফেরদৌসী রহমান এবং রুনা লায়লার মতো লিজেন্ডদের কণ্ঠকে তিনি বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দেন এবং উপমহাদেশে বাংলা সঙ্গীত ও সংস্কৃতিকে বিপুল জনপ্রিয় করে তোলেন। এমনকি আমাদের মহান শহীদ দিবসের গানের সুরকার, অমর শহীদ আলতাফ মাহমুদ যে এত বড় মাপের কণ্ঠশিল্পী ও সুরকার হিসেবে গড়ে উঠেছিলেন—তার পেছনেও মূল অনুপ্রেরণা ও মেন্টর ছিলেন এই দেবু ভট্টাচার্য।
জীবনসায়াহ্নে এসেও সুরের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কমেনি। টেলিভিশন ও মঞ্চে তাঁর জীবনের সর্বশেষ পরিবেশনাটি ছিল এক অভাবনীয় ফিউশন—বিখ্যাত জ্যাজ শিল্পী চিকো হেরম্যান-এর সঙ্গে তাঁর সেই যৌথ ‘ফ্ল্যুট-সিম্ফনি’ আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে আছে।
চলচ্চিত্রের তালিকা
প্লেব্যাক মিউজিকের জগতেও তিনি বেশ কিছু স্মরণীয় চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন:
চরিত্রহীন (১৯৭৫)
বধু বিদায় (১৯৭৮)
দম মার দম
পুরস্কার, স্বীকৃতি ও চিরবিদায়
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা লাভ করেছেন:
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৭৫): ‘চরিত্রহীন’ চলচ্চিত্রের জন্য লোকমান হোসেন ফকিরের সাথে যৌথভাবে প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত ‘শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক’ ক্যাটাগরিতে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন।
একুশে পদক (১৯OT/১৯৯৭): শিল্পকলা ও সঙ্গীতে অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ প্রদান করা হয়।
সংস্কৃতি মঞ্চ স্মারক শুভেচ্ছা (২০১৫): বাঁশি বাজানোয় অনন্য দক্ষতার জন্য ২০১৫ সালে তাঁকে মরণোত্তর এই সম্মাননা দেওয়া হয়।
১৯৯৪ সালে এই সুরের জাদুকর ও নিভৃতচারী সাধক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দেবু ভট্টাচার্য এমন একজন মানুষ, যিনি ক্যানভাসে রঙের আঁচড় দিতে পারতেন, ফুঁ দিয়ে বাঁশিতে রাগ তুলতে পারতেন, আবার কলম হাতে কালজয়ী গানও লিখতে পারতেন। আলতাফ মাহমুদ কিংবা রুনা লায়লার মতো নক্ষত্রদের যিনি গাইড করেছেন, সেই দেবু ভট্টাচার্যকে ভুলে যাওয়া মানে নিজেদের শিকড়কে ভুলে যাওয়া। প্রতিদিন ভোরে যখন রেডিও বা টেলিভিশনে বেজে ওঠে “প্রতিদিন তোমায় দেখি সূর্যের আগে”—তখন অলক্ষ্যেই সূর্যের আলোর মতো আমাদের মনে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন দেবু ভট্টাচার্য।
