মিউজিক গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই আগস্ট ২০২৬, ১২:২৫ পিএম

বাংলা গানের ভুবনে কিছু মানুষ আসেন, যাঁরা কেবল গান সৃষ্টি করেন না—একটি সময়কে সুরে বেঁধে রেখে যান। তাঁদের অনন্য সৃষ্টির মধ্য দিয়েই একটি প্রজন্ম তার প্রেম, বিরহ, আনন্দ, বেদনা ও দেশপ্রেমের ভাষা খুঁজে পায়। সুরের ভুবনে এমনই এক কালজয়ী ব্যক্তিত্ব আলাউদ্দিন আলী। তিনি ছিলেন একাধারে সফল সুরকার, সংগীত পরিচালক, গীতিকার এবং দক্ষ বেহালাবাদক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতের রূপালী ও স্বর্ণালি ইতিহাসের কথা বলতে গেলে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করতে হয়।
শৈশব ও সংগীতে প্রথম যাত্রা
আলাউদ্দিন আলী ১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ওস্তাদ জাদব আলী এবং মা জোহরা খাতুন। মাত্র দেড় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি ঢাকার মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে চলে আসেন। সেখানেই তিন ভাই ও দুই বোনের মাঝে তাঁর বেড়ে ওঠা। সংগীতে তাঁর প্রথম হাতেখড়ি ঘটে ছোট চাচা সাদেক আলীর কাছে। পারিবারিক আবহ ও শৈশবের প্রবল অনুরাগের কারণে সুর ও বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
কৈশোরেই চলচ্চিত্রের পেশাদার সংগীত জগতে পা রাখেন আলাউদ্দিন আলী। ১৯৬৮ সালে বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। শুরুর দিকে তিনি কিংবদন্তি সুরস্রষ্টা শহীদ আলতাফ মাহমুদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজের সঙ্গেও দীর্ঘদিন কাজ করার সুযোগ পান। প্রথিতযশা এই গুণী সুরকারদের সান্নিধ্য তাঁর সংগীতজীবনের ভিত্তিকে সুদৃঢ় ও সমৃদ্ধ করে তোলে।
নিজস্ব সুরের নান্দনিকতা ও সংগীত দর্শন
আলাউদ্দিন আলীর সংগীতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি লোকজ সুরের মাটির গন্ধের সঙ্গে ধ্রুপদি বা শাস্ত্রীয় সংগীতের নান্দনিকতাকে চমৎকারভাবে মিলিয়ে দিতেন। তাঁর সুরে একদিকে যেমন ছিল বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের সহজ-সরল আবেগ, অন্যদিকে ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতের পরিশীলিত রূপায়ণ। ফলে তাঁর তৈরি সুরগুলো একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছাত এবং শিল্পগত বিচারে হতো অত্যন্ত মানসম্মত।
প্রায় চার দশকের বিস্তৃত সংগীতজীবনে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা, এন্ড্রু কিশোর, সৈয়দ আব্দুল হাদী, শাম্মী আক্তারসহ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি ভারত ও পাকিস্তানের বহু খ্যাতিমান শিল্পী তাঁর সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন। “একবার যদি কেউ ভালোবাসতো”, “যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়”, “ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়”, “সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি” এবং “আছেন আমার মোক্তার”-এর মতো অগণিত কালজয়ী সৃষ্টি তাঁর অনন্য মেধার স্বাক্ষর বহন করে।
বহুমুখী প্রতিভা ও মহাপ্রস্থান
তিনি কেবল সুরকার বা সংগীত পরিচালক ছিলেন না, ছিলেন একজন প্রতিভাবান গীতিকারও। চলচ্চিত্রের দৃশ্যপট, পাত্র-পাত্রীর আবেগ ও কাহিনির সঙ্গে মিল রেখে সংগীত সৃষ্টির অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে তৎকালীন অন্যান্য সুরকারদের থেকে আলাদা করে রেখেছিল। সুরের পাশাপাশি গান লিখেও তিনি লাভ করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সুদীর্ঘ কর্মজীবনে অগণিত পুরস্কারের পাশাপাশি তিনি অর্জন করেছেন কোটি কোটি শ্রোতার ভালোবাসা।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে দূরারোগ্য ব্যাধির সঙ্গে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করতে হয়েছে এই সুরের জাদুকরকে। অবশেষে ২০২০ সালের ৯ আগস্ট ৬৭ বছর বয়সে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মানুষ হিসেবে সুরের রাজপুত্র আলাউদ্দিন আলী আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট অমলিন সুর তরঙ্গের মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে আছেন ও থাকবেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।
মন্তব্য