বিনয় বাঁশী জলদাস ছিলেন একজন বাংলাদেশী ঢোল বাদক। যন্ত্রসঙ্গীতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০০১ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে।
Table of Contents
প্রারম্ভিক জীবন
বিনয় বাঁশী জলদাস ১৯১১ সালে (১৩১৮ বঙ্গাব্দ) তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদন্ডী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা উপেন্দ্র লাল জলদাস এবং মাতা সরবালা জলদাস। তিন ভাইয়ের মধ্যে বিনয় সবার বড়। তার অপর দুই ভাই হলেন ধীরেন্দ্র জলদাস এবং রবীন্দ্র জলদাস।
শৈশবে তিনি রামসুন্দর বসাকের বাল্যশিক্ষা তিনবার অধ্যায়ন করেন। পাশাপাশি তালিম নিতেন ঢোল বাজানোর। এক সময় রমেশ শীলের সাথে বাজাতে গিয়ে তার ঢোল বাজানোর দক্ষতা ফুটে ওঠে। মূলত তার দুজন যন্ত্রগুরু ছিলেন। একজন তার পিতার বন্ধু স্বগ্রামের ত্রিপুরাচরণ, ও অন্যজন পাশের গ্রাম রাইখালীর লক্ষিন্দর জলদাস। বিনয়বাঁশী এই দুজন যন্ত্রগুরুর কাছে ঢোল বাজানোর কলাকৌশল রপ্ত করেন।
কর্মজীবন
বিনয় বাঁশী জলদাস উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবিয়াল রমেশ শীলের সাথে ঢোল বাদনে যোগ দেন। তিনি দীর্ঘ ৩৫ বছর রমেশের সাথে ঢোল বাজান। ১৯৪৫ সালে বিনয় রমেশের সাথে কলকাতার মোহাম্মদ আলী পার্কে অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে অনুষ্ঠিত যুদ্ধবিরোধী শান্তির কবিগানে যোগ দেন। ১৯৪৮ সালে কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্কে অনুষ্ঠিত কবিয়াল রমেশ শীলের শ্রেষ্ঠ কবিয়াল শিরোপা জেতার অনুষ্ঠানে অংশ্রগ্রহণ করেন।
১৯৫৬ সালে বিনয় কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন ও ঢাকার কার্জন হলের সাংস্কৃতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৯–৭০ সালে তিনি রায়গোপাল ও ফণী বড়ুয়ার দোহার হিসেবে সারা বাংলায় সফর করেন। ১৯৮০ সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর আমন্ত্রণে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সংস্কৃতি সম্মেলনে যোগ দেন।
১৯৯০ সালে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উদীচীর লোকসংস্কৃতি উৎসবে ঢোল বাজান। ১৯৯৯ সালে তিনি ঢোল বাজিয়ে যশোরে অনুষ্ঠিত উদীচীর জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন করেন। ২০০০ সালে গুরুতর অসুস্থ থাকার পরও চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন।
ব্যক্তিগত জীবন
বিনয় বাঁশী জলদাস সুরবালা জলদাসের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দুই পুত্র। বাবুল জলদাস (লোক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান) বিনয়বাঁশী শিল্পীগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা। সংগঠনটি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঢোল বাজায়। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে রয়েছেন বাবুলের ছেলে এবং বিনয়ের নাতি শ্রী বিপ্লব জলদাস। আরেক পুত্র হরিলাল জলদাস কীর্তনীয়া দল প্রতিষ্ঠা করেন।
অসুস্থতা ও মৃত্যু
২০০০ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। লন্ডনে বাংলাদেশ উৎসবে ঢোল বাদনের জন্য সরকার আমন্ত্রণ জানালে তার স্থলে তার ছেলে বাবুল জলদাস সেখানে ঢোল বাজাতে যান। ২০০২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। দুই মাস এই রোগে ভোগে ৫ এপ্রিল দিবাগত রাত দেড়টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সম্মাননা ও স্মারক
২০০১ সালে যন্ত্রসঙ্গীতে অবদানের জন্য বিনয়বাঁশী জলদাস বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক লাভ করেন।
২০১০ সালে বিনয়বাঁশী জলদাস স্মরণে (লোক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান) বিনয়বাঁশী শিল্পীগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন শিল্পী ও সংগঠক শ্রী বিপ্লব জলদাস।
২০১৩ সালে ৬ এপ্রিল বিনয় বাঁশীর বাস্তুভিটায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর ডি কে দাশ মামুন বিনয় বাঁশীর ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। এটি নির্মাণ করতে সময় লাগে ১ বছর।
