ভারতের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী অরিজিৎ সিং তাঁর অসাধারণ কণ্ঠ, বিনয়ী স্বভাব ও সাধারণ জীবনযাপনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। বলিউডের অন্যতম সফল গায়ক হয়েও তারকাখ্যাতির প্রচলিত আড়ম্বর থেকে নিজেকে দূরে রাখতেই পছন্দ করেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে প্রচারের আলো এড়িয়ে চলা এবং সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করার প্রবণতা তাঁকে ভক্তদের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে। তবে বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে অনেক সময় নিজের মতো করে সময় কাটানোও কঠিন হয়ে পড়ে এই শিল্পীর জন্য। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে এমনই এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। ভক্তদের সেলফি ও ছবি তোলার আবদার থেকে রক্ষা পেতে শেষ পর্যন্ত তাঁকে দৌড়ে স্থান ত্যাগ করতে হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাতে। বন্ধুদের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের পরিচিত পাপ্পু ধাবায় সময় কাটাতে গিয়েছিলেন অরিজিৎ। সেখানে বেশ স্বাভাবিকভাবেই সময় কাটান তিনি। তাঁর পরনে ছিল সাধারণ একটি টি-শার্ট। কোনো বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা কিংবা তারকাসুলভ আয়োজন ছাড়াই ধাবায় গিয়েছিলেন এই সংগীতশিল্পী।
খাবার খাওয়া শেষে বন্ধুদের সঙ্গে ধাবা থেকে বের হওয়ার সময় এক ভক্তের চোখে পড়েন অরিজিৎ। প্রিয় শিল্পীকে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন ওই ভক্ত। তাঁকে ঘিরে অন্যদের মধ্যেও খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে অনুরাগীদের ভিড় বাড়তে শুরু করে।
ভক্তদের অনেকেই অরিজিতের সঙ্গে ছবি তুলতে এবং সেলফি নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ তাঁকে ঘিরে ধরার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি ক্রমেই এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে স্বাভাবিকভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় বেশি সময় অপেক্ষা না করে দ্রুত সেখান থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন অরিজিৎ। একপর্যায়ে তাঁকে দৌড়ে স্থান ত্যাগ করতে দেখা যায়। মজার বিষয় হলো, তখনও তাঁর হাতে ছিল খাবারের একটি প্যাকেট। সঙ্গে থাকা বন্ধুরাও নিজেদের হাতে খাবারের প্যাকেট নিয়ে তাঁর পিছু পিছু দৌড়াতে শুরু করেন। ঘটনাটির এই দৃশ্য উপস্থিত কারও ক্যামেরায় ধারণ করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও, মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। অনেকেই ভিডিওটি দেখে মজার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ অরিজিতের দৌড়ে পালানোর দৃশ্যকে হাস্যরসের সঙ্গে দেখেছেন, আবার কেউ বিষয়টিকে একজন জনপ্রিয় শিল্পীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
নেটিজেনদের একটি বড় অংশের মতে, কোনো শিল্পী জনপ্রিয় হলেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ওপর ভক্তদের অবাধ অধিকার তৈরি হয় না। একজন সংগীতশিল্পী মঞ্চে গান গাইবেন, দর্শকদের ভালোবাসা গ্রহণ করবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কাজের বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নিজের মতো করে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার অধিকারও তাঁর রয়েছে।
তাঁদের মতে, প্রিয় শিল্পীকে হঠাৎ সামনে পেয়ে ভক্তদের আবেগাপ্লুত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই আবেগের প্রকাশ যেন শিল্পীর জন্য অস্বস্তির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। ছবি তোলার অনুরোধ করা যেতে পারে, তবে সেই অনুরোধে সম্মতি না মিললে তা মেনে নেওয়াই সৌজন্যের পরিচয়।
অন্যদিকে, কিছু নেটিজেন মনে করছেন, ভক্তদের আবদার খুব বেশি অস্বাভাবিক ছিল না। তাঁরা ভালোবাসা থেকেই প্রিয় গায়কের সঙ্গে একটি ছবি তুলতে চেয়েছিলেন। সে কারণে অরিজিতের দ্রুত স্থান ত্যাগের ঘটনাকে কেউ কেউ কিছুটা বাড়াবাড়ি হিসেবেও দেখছেন। তবে একজন শিল্পী কখন ছবি তুলবেন কিংবা ভক্তদের সঙ্গে কথা বলবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাঁর নিজেরই থাকা উচিত বলে মত দিয়েছেন অনেকে।
সাদামাটা জীবনযাপনেই আলাদা অরিজিৎ
অরিজিৎ সিংয়ের জনপ্রিয়তার পেছনে তাঁর সংগীতপ্রতিভার পাশাপাশি ব্যক্তিত্বেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। বলিউডের অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে তিনি ভারতীয় সংগীতাঙ্গনে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। হিন্দি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বাংলা গানেও তাঁর অবদান রয়েছে। বিভিন্ন ভাষার শ্রোতার কাছে তাঁর কণ্ঠ সমানভাবে সমাদৃত।
কিন্তু পেশাগত সাফল্য তাঁকে খুব একটা বদলে দেয়নি—এমন ধারণাই তাঁর ভক্তদের মধ্যে প্রচলিত। সাধারণ পোশাকে চলাফেরা, পরিচিত পরিবেশে সময় কাটানো এবং প্রচারমাধ্যমের অতিরিক্ত মনোযোগ এড়িয়ে চলার প্রবণতা তাঁকে অন্য অনেক তারকার চেয়ে আলাদা করেছে।
তাঁর এই সাধারণ জীবনযাপনের কারণে ভক্তদের আগ্রহও স্বাভাবিকভাবেই বেশি। অনেকেই প্রিয় শিল্পীকে কাছ থেকে দেখতে চান, তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে চান কিংবা সামান্য সময় কথা বলার সুযোগ খোঁজেন। কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিসরের যে সংঘাত তৈরি হয়, মুর্শিদাবাদের ঘটনাটি তারই একটি উদাহরণ।
তারকাদের প্রতি ভক্তদের ভালোবাসা তাঁদের কাজের অনুপ্রেরণা জোগায়। তবে সেই ভালোবাসার প্রকাশে পারস্পরিক সম্মান থাকা জরুরি। একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত সময়, স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়াও ভক্তদের দায়িত্ব। অরিজিৎ সিংয়ের মধ্যরাতের এই ঘটনা আবারও সেই বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে এসেছে।














