মুজিব পরদেশী । বাংলাদেশি কণ্ঠশিল্পী

বাংলা লোকসংগীত ও বিরহী সুরের জগতে ‘মুজিব পরদেশী’ একটি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও জনপ্রিয় নাম। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত তাঁর দরদি কণ্ঠ, সহজ-সরল পরিবেশন শৈলী এবং লোকজ বিরহের বিয়োগান্তক সুর কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে সব শ্রেণীর সংগীতপ্রেমীদের কাছে তিনি বিরহী গানের এক অবিসংবাদিত প্রতীক।

প্রাথমিক জীবন, পরিবার ও শিক্ষাজীবন

মুজিব পরদেশীর প্রকৃত নাম মুজিবুর রহমান মোল্লা। তিনি পাকিস্তানের করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে তাঁর পিতা ইউসুফ আলী মোল্লা ব্যবসার সূত্রে দীর্ঘদিন অবস্থান করছিলেন। ছয় বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে মুজিব পরদেশী ছিলেন পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান।

১৯৬৫ সালে, মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় চলে আসেন। তিনি কেবল এক সুরসাধকই ছিলেন না, বরং শিক্ষাদীক্ষায়ও ছিলেন অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত। তৎকালীন সময়ে গ্রামীণ সুরসাধকদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার হার কম হলেও, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএ (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন।

সংগীতশিক্ষা ও সুরসাধনার সূচনা

কিশোর বয়স থেকেই সুরের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রাথমিক তালিম নিয়েছেন ওস্তাদ গোলাম হায়দার আলী খান, ওস্তাদ ফজলুল হক এবং ওস্তাদ আমানুল্লাহর মতো গুণী সুরসাধকদের কাছে। কণ্ঠসাধনার পাশাপাশি তিনি তবলার ওপরও দক্ষ দখল অর্জন করেন। ওস্তাদ মনির হোসেন খান এবং ওস্তাদ সাজ্জাদ হোসেন খানের কাছে তিনি তবলার প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ নেন।

সংগীত জীবনের গোড়ার দিকে তিনি লোকসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী আবদুল আলীমের সাথে দীর্ঘদিন কাজের সুযোগ পান এবং তাঁর সুরের ধারা কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন। বাংলাদেশ বেতারে (রেডিওতে) একজন পেশাদার তবলা বাদক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে রেডিও ও টেলিভিশনে সুরকার হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সুরসাধক ও সংগীত পরিচালক সত্য সাহা, সুবল দাস, ধীর আলী এবং খন্দকার নূরুল আলমের মতো গুণী ব্যক্তিত্বদের সহকারী হিসেবে কাজ করে চলচ্চিত্রে সুরসংযোজনের খুঁটিনাটি রপ্ত করেন।

‘বন্দী কারাগারে’ ও ক্যাসেট যুগের একচ্ছত্র রাজত্ব

সুরকার ও যন্ত্রশিল্পী হিসেবে কাজ করলেও পরবর্তীতে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে মুজিব পরদেশী যে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেন, তা বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘বন্দী কারাগারে’ মুক্তি পাওয়ার পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অ্যালবামের শিরোনাম গান ‘আমি বন্দী কারাগারে’ তৎকালীন তরুণ ও সাধারণ শ্রোতাদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।

আশির দশকে অডিও ক্যাসেটের যুগে তাঁর এই অ্যালবামটি বিক্রয়সংখ্যার দিক থেকে নতুন রেকর্ড গড়েছিল। বিরহ, বিচ্ছেদ ও জীবনের বাস্তবতার করুণ চিত্রায়ন তাঁর কণ্ঠে এক অনন্য মাত্রা পেত। এখন পর্যন্ত তাঁর প্রায় ৪২টি একক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে, যার প্রতিটিই বাজারে বিপুল সাফল্য পেয়েছিল।

চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা ও অভিনয়

কণ্ঠশিল্পী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়ার আগেই তিনি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। ‘অশান্ত ঢেউ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রথম সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এরপর তিনি হাফিজ উদ্দিনের নির্দেশনায় ‘অসতী’ সহ প্রায় ২০টি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন। তাঁর সংগীত পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যতম ফিরোজ আল মামুনের ‘দৌড়’।

সুর ও কণ্ঠের পাশাপাশি তিনি অভিনয়শিল্পেও নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। সিরাজ হায়দার পরিচালিত ‘সুখ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রূপালী পর্দায় তাঁর অভিনয় জীবনের সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে আশির দশকের শেষভাগে ফিরোজ আল মামুনের পরিচালনায় ‘মোহন মালার বনবাস’ চলচ্চিত্রেও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন।

কালজয়ী ও জনপ্রিয় গানসমূহ

মুজিব পরদেশীর গাওয়া গানগুলো তৎকালীন বাংলা লোকজ ও আধুনিক পপ-সংগীতের মেলবন্ধনে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিল। তাঁর গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু কালজয়ী গান:

  • আমি বন্দী কারাগারে
  • কলমে নাই কালি
  • তোমায় আমি হলেম অচেনা
  • আমার সাদা দিলে কাদা লাগাই গেলি রে বন্ধুয়া
  • আমি যার লাগি হইলাম অনুরাগী গো প্রাণসজনী
  • আমার জনম গেল কাঁদিতে
  • আমারে নি পড়ে তোমার মনে
  • আমার সোনা বন্ধুরে

সংগীতশৈলী ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

মুজিব পরদেশীর গানের মূল শক্তির জায়গা ছিল খাঁটি গ্রামীণ সুরের সঙ্গে শহুরে অডিও ক্যাসেট সংস্কৃতির এক চমৎকার সমন্বয়। অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও দরদি কণ্ঠে গাওয়া তাঁর গানগুলোতে সাধারণ মানুষের মনের কষ্ট, বিরহ ও বিচ্ছেদের অনুভূতিগুলো এত জীবন্তভাবে ফুটে উঠত যে শ্রোতারা খুব সহজেই নিজেদের জীবনকে তাঁর গানের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সেরা বিদ্যাপীঠ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেও মাটি ও মানুষের খাঁটি সুরকে লালন করার এই দৃষ্টান্ত তাঁকে বাংলাদেশের অডিও জগতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।