রাগ কলাবতী । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে রাগ কলাবতী এক অত্যন্ত মিষ্টি, প্রফুল্ল ও আকর্ষণীয় পেন্টাটোনিক (ঔড়ব-ঔড়ব) রাগ। এটি মূলত দক্ষিণ ভারতীয় (কর্ণাটিক) সঙ্গীত পদ্ধতি থেকে উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত ধারায় আত্মীকৃত হয়েছে। স্বর-বিন্যাসে ঋষভ ও মধ্যম বর্জিত হওয়ায় এবং কোমল নিষাদের শৈল্পিক উপস্থিতির কারণে রাগটিকে উত্তর ভারতীয় পদ্ধতিতে খাম্বাজ ঠাট-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই রাগের সহজ-সরল স্বরপ্রয়োগ এবং চঞ্চল রূপ একে যেমন শাস্ত্রীয় মঞ্চে জনপ্রিয় করেছে, তেমনি আধুনিক সুগম সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র সঙ্গীতেও এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে।

রাগ কলাবতী

রাগ কলাবতীর শাস্ত্রীয় পরিচয় ও রূপরেখা

রাগ কলাবতীর মেজাজ প্রধানত আনন্দদায়ক, মধুর, শৃঙ্গার ও ভক্তি রসাত্মক। এর গঠনে জটিলতা কম হলেও স্বরক্ষেপণের সূক্ষ্মতার ওপর রাগের সৌন্দর্য নির্ভর করে।

শাস্ত্রীয় উপাদানবিবরণ
ঠাটের নামখাম্বাজ
জাতিঔড়ব-ঔড়ব (আরোহণ ও অবরোহণ উভয় ক্ষেত্রেই ৫টি করে স্বর)
বর্জিত স্বরঋষভ (র) এবং মধ্যম (ম)
বাদী স্বরপঞ্চম (প)
সংবাদী স্বরষড়জ (স)
প্রকৃতি/ভাবমধুর, চঞ্চল, উজ্জ্বল, শৃঙ্গার ও ভক্তিমূলক
পরিবেশন কালরাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে রাত ১২টা)
প্রধান অঙ্গপূর্বাঙ্গ প্রধান (মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে বিস্তার প্রখর)
ব্যবহৃত স্বরষড়জ (স), শুদ্ধ গান্ধার (গ), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ ধৈবত (দ) এবং কোমল নিষাদ (ণ)

আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়

কলাবতী রাগের চলন সোজা এবং লাফানো গতিসম্পন্ন (Leaping Motion)।
  • আরোহণ: স গ প ধ ণ র্স
  • অবরোহণ: র্স ণ ধ প গ স
  • পকড় (চিহ্নিতকারী স্বরগুচ্ছ): গ প ধ ণ ধ প, গ প গ স; অথবা ণ্ ধ প, গ প ধ ণ র্স

স্বর-প্রয়োগের বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য

১. ঔড়ব-ঔড়ব কাঠামোর প্রফুল্লতা: ঋষভ (র) এবং মধ্যম (ম) সম্পূর্ণ বর্জিত হওয়ায় স্বরগুলোর মাঝে একটি দূরত্ব তৈরি হয়। এই স্বর-ডিঙানো চালচলন রাগকে অত্যন্ত জীবন্ত, তরল এবং আনন্দপূর্ণ অনুভূতি দান করে।

২. কোমল নিষাদের (ণ) ব্যবহার: কলাবতীতে কোমল নিষাদ বক্রভাবে বা নির্দিষ্ট স্বরগুচ্ছের সাথে ব্যবহৃত হয় (যেমন: ‘ধ ণ ধ প’)। কোমল নিষাদের মৃদু স্পর্শ রাগে একধরনের স্নিগ্ধতা ও মাধুর্য সৃষ্টি করে।

৩. পঞ্চম ও ষড়জের প্রাধান্য: বাদী স্বর ‘পঞ্চম’ (প) এবং সংবাদী স্বর ‘ষড়জ’ (স) হওয়ায় গান গাওয়ার সময় পঞ্চমের ওপর বিশ্রাম বা ন্যাশ নেওয়া হয়। ‘গ প ধ’ এবং ‘প ধ ণ ধ প’ এই স্বরগুচ্ছগুলো রাগটির প্রাণভোমরা।

উৎস, ইতিহাস ও গুণী সাধকদের অবদান

কর্ণাটিক সঙ্গীতের রাগ ‘কলাবতী’ (বা ইয়াগপ্রিয়ার কাছাকাছি রূপ) থেকে এর উৎপত্তি হলেও উত্তর ভারতীয় পণ্ডিতগণ একে নিজস্ব শৈলীতে রূপান্তর করেছেন। বিংশ শতাব্দীতে মহারাষ্ট্র ও উত্তর ভারতের বিশিষ্ট সঙ্গীতসাধকগণ এই রাগকে খেয়াল ও উপ-শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করে তোলেন।

  • জনপ্রিয়করণে অবদান: পণ্ডিত রাও নাগরকর, রওশন আরা বেগম এবং গাঙ্গুবাই হাঙ্গাল রাগ কলাবতীকে উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত মঞ্চে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
  • পণ্ডিত ভীমসেন জোশীর ভূমিকা: পরবর্তীতে পণ্ডিত ভীমসেন জোশী তাঁর দরদী কণ্ঠে দ্রুত খেয়াল এবং অসংখ্য মারাঠি ‘অভং’-এ রাগ কলাবতীর রূপায়ণ ঘটিয়ে একে সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে চিরস্মরণীয় করে তোলেন।
  • ওস্তাদ আমীর খান ও অন্যান্যরা: ওস্তাদ আমীর খানের মতো মহাগায়করা বিলম্বে ও তারানায় কলাবতীর গম্ভীর ও ধ্যানমগ্ন দিকটি ফুটিয়ে তুলেছেন।

সমপ্রকৃতির রাগের সাথে বৈসাদৃশ্য ও তুলনা

কলাবতী বনাম জনসংমোহিনী

অনেকে রাগ কলাবতীর সাথে রাগ জনসংমোহিনীকে গুলিয়ে ফেলেন, কারণ দুটিতেই ঋষভ ও মধ্যম বর্জিত (ঔড়ব-ঔড়ব):
  • রাগ কলাবতী: খাম্বাজ ঠাটের অন্তর্গত এবং এতে কোমল নিষাদ (ণ) ব্যবহৃত হয়।
  • রাগ জনসংমোহিনী: কল্যাণ বা বিলাবল অঙ্গের কাছাকাছি এবং এতে শুদ্ধ নিষাদ (নি) ব্যবহৃত হয়।

কলাবতী বনাম খাম্বাজ

  • খাম্বাজ একটি সম্পূর্ণ বা ষাড়ব প্রকৃতির রাগ, যেখানে ঋষভ ও মধ্যমের ব্যবহার স্পষ্ট এবং এতে কোমল ও শুদ্ধ—উভয় নিষাদই দেখা যায়।
  • কলাবতী কেবল পাঁচটি স্বর নিয়ে গঠিত এবং এর স্বরপ্রয়োগ খাম্বাজ অপেক্ষা অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট ও চঞ্চল।

পরিবেশন শৈলী ও নানা ধারার গানে প্রয়োগ

কলাবতী রাগটি চঞ্চল ও গতিময় হওয়ায় খেয়াল সঙ্গীতের দ্রুত খেয়াল, তারানা, চতুরঙ্গ এবং থুমরি বা দাদরা পরিবেশনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

নজরুল সঙ্গীতে প্রয়োগ

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর রাগাশ্রয়ী গানে কলাবতীর মাধুর্যকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যবহার করেছেন।
  • “মহুয়া বনে বন পাপিয়া, একেলা ঝুরে নিশি জাগিয়া” — এই কালজয়ী গানটিতে রাগ কলাবতীর মিষ্টি রূপ ও চঞ্চল ব্যাকুলতা অপূর্বভাবে ফুটে উঠেছে।

ভারতীয় চলচ্চিত্রে রাগ কলাবতী

চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালকেরা রাগ কলাবতীর সহজ ও শ্রুতিমধুর স্বর-কাঠামো ব্যবহার করে বহু জনপ্রিয় গান সৃষ্টি করেছেন:
গানচলচ্চিত্র / বছরসঙ্গীত পরিচালককণ্ঠশিল্পীপ্রয়োগের ধরন
মাইকা পিয়া বুলাভেসুর সঙ্গম (১৯৮৫)লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলাললতা মঙ্গেশকর / সুরেশ ওয়াডকরবিশুদ্ধ কলাবতী রাগের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
পিয়া নহীঁ আয়েদরওয়াজা (১৯৬২)সলিম ইকবালআমানত আলী খান, নূরজাহানশাস্ত্রীয় পরিচ্ছন্নতায় ভরা খাঁটি কলাবতী।
না তো কারাওয়াঁ কি তালাশ হায়বারসাত কি রাত (১৯৬০)রোশনমো: রফি, মান্না দে, আশা ভোঁসলেশুরুতে বিশুদ্ধ কলাবতী, পরে খাম্বাজ ও শুদ্ধ নিষাদের চমৎকার সংমিশ্রণ।
ইয়ে তারা ওহ তারাস্বদেশ (২০০৪)এ. আর. রহমানউদিত নারায়ণকলাবতীর সুরের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক পপ ও শাস্ত্রীয় ফিউশন।
কাহে তরসায়ে জিয়ারাচিত্রলেখা (১৯৬৪)রোশনউষা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলেকলাবতীর নির্যাসযুক্ত একটি আধা-শাস্ত্রীয় গান।
হাম কিসিসে কম নহীঁহাম কিসিসে কম নহীঁ (১৯৭৭)আর. ডি. বর্মনআশা ভোঁসলে, মো: রফিআধুনিক তাল ও পপ শৈলীতে রাগের আংশিক ব্যবহার।
সনম তু বেওয়াফা কে নাম সেখিলোনা (১৯৭০)লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলাললতা মঙ্গেশকরলোকসুর ও কলাবতীর মিষ্টি মিশ্রণ।
দিল মেঁ ঔর তো ক্যা রাখা হায়গজলকাইয়ুম / বিভিন্নপঙ্কজ উদাসগজলে কলাবতীর বিষাদময় ও মিষ্টি প্রয়োগ।

গ্রন্থপঞ্জি ও আকর সূত্র

  • সঙ্গীত শাস্ত্র (তৃতীয় খণ্ড) — শ্রীইন্দু ভূষণ রায়।
  • উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত — শক্তিপদ ভট্টাচার্য, নাথ ব্রাদার্স (২২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭)।
  • সঙ্গীত পরিচিত (উত্তর ভাগ) — শ্রীনীলরতন বন্দ্যোপাধ্যায়, হসন্তিকা (৪ এপ্রিল ১৯৭৯)।
  • রূপরং (রাগ পরিচয়) — পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র শ্রীবাস্তব।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।