রাগ ভূপাল টোড়ি । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল আঙিনায় এমন কিছু সুর থাকে, যা শোনা মাত্রই মন জাগতিক কোলাহল ভুলে কোনো এক অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতে চায়। এমনই এক পরম শান্ত, তীব্র ভক্তিপূর্ণ এবং মেলানকোলিক (বিষণ্ণ মধুর) রাগ হলো ‘রাগ ভূপাল টোড়ি’। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে এটি ‘ভৈরবী’ ঠাটের অন্তর্গত। নামের শেষে “টোড়ি” যুক্ত থাকলেও এর চরিত্রে এক অদ্ভুত রহস্য লুকিয়ে আছে। প্রথাগত টোড়ি রাগের মতো এতে ‘কড়ি মধ্যম’ ব্যবহার করা হয় না, যার ফলে এর চলনটি বিখ্যাত ‘বিলাসখানি টোড়ি’ রাগের সাথে এক চমৎকার সামঞ্জস্য তৈরি করে। এই রাগের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর সীমিত স্বরসংখ্যার পরিমিত ব্যবহারের মধ্যে।

রাগ ভূপাল টোড়ি । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

 

রাগের কারিগরি ও সুরের অনন্য বুণন:

রাগ ভূপাল টোড়ির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর প্রাচীন এবং আধ্যাত্মিক ধাঁচ। এই রাগে মধ্যম (মা) এবং নিষাদ (নি) স্বর দুটিকে সম্পূর্ণ বর্জন করা হয়েছে। grandparent পাঁচ স্বরের এই সীমিত ক্যানভাসেই ফুটে ওঠে এক অপার্থিব সুরের মায়াজাল।

  • ঠাট: ভৈরবী
  • জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহণ ও অবরোহণ—উভয় পথেই পাঁচটি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)
  • আরোহণ: স ঋ জ্ঞ প দ র্স (এখানে ঋ ও জ্ঞ হলো কোমল স্বর)
  • অবরোহণ: র্স দ প জ্ঞ ঋ স
  • বাদীস্বর (রাগের প্রধান রাজা): কোমল ধৈবত (দ)
  • সমবাদী স্বর (রাগের উজির বা মন্ত্রী): কোমল গান্ধার (জ্ঞ)
  • অঙ্গ: উত্তরাঙ্গ প্রধান
  • পকড় (রাগের আসল চাবিকাঠি): দপ, জ্ঞপ, দপ, জ্ঞর, জ্ঞঋস

 

এই রাগে কোমল ঋষভ (ঋ) ও কোমল ধৈবত (দ) স্বর দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর কোমল গান্ধার (জ্ঞ) স্বরটি যখন কোনো মধ্যম ছাড়াই আলতো করে এক অবর্ণনীয় রেশ তুলে প্রক্ষিপ্ত হয়, তখনই রাগটি তার নিজস্ব ‘টোড়ি’ ঘরানার আভিজাত্য ও স্বতন্ত্রতা প্রকাশ করে।

সময়ের মায়াজাল, ব্যঞ্জনা ও শ্রোতার মনস্তত্ত্ব:

রাগ ভূপাল টোড়ির মূল ম্যাজিকটা টের পাওয়া যায় এর পরিবেশনের সময়ে। এই রাগের জন্য ওস্তাদরা বেছে নেন প্রাতঃকাল বা ভোরবেলাকে। এটি মূলত ভোরবেলার এক পরম ধ্যানযোগ্য রাগ।

যখন রাতের অন্ধকার কেটে উষালগ্নের প্রথম আলো ফোটে, পৃথিবী যখন এক অলৌকিক নিস্তব্ধতায় ডুবে থাকে—ঠিক তখনই তানপুরার জাদুকরী ঝংকারে জেগে ওঠে ভূপাল টোড়ি। এই রাগের প্রধান রস হলো ‘করুণা’ ও ‘ভক্তি’। এটি মানুষের মনে এক তীব্র বৈরাগ্য, বিনম্র প্রার্থনা এবং গভীর মানসিক স্থিরতার জন্ম দেয়। সকালের সেই স্নিগ্ধ শান্ত পরিবেশে যখন এই রাগের আলাপ ভেসে আসে, তখন শ্রোতার হৃদয় এক অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। এটি কেবল কিছু স্বরের জোড়াতালি নয়, বরং ভোরের আলোয় মানুষের অন্তরাত্মাকে পরমেশ্বরের চরণে সঁপে দেওয়ার এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মোপলব্ধির ম্যাজিক।

তথ্যসূত্র:

  • উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত — শক্তিপদ ভট্টাচার্য। নাথ ব্রাদার্স (২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৭)।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।