সময় পেরিয়েও অম্লান হেমন্তের সুরধারা

বাংলা গানের ইতিহাসে এমন কিছু কণ্ঠ রয়েছে, যা সময়ের সীমা অতিক্রম করে প্রজন্মের পর প্রজন্মে সমানভাবে আবেদন ধরে রেখেছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সেই বিরল শিল্পীদের অন্যতম। ‘তুমি এলে, অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এল’, ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়’, ‘এই রাত তোমার আমার’ কিংবা ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’—এই গানগুলো শুধু সুর বা গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাঙালির দৈনন্দিন জীবন, আবেগ ও স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

রেডিও, গ্রামোফোন, ক্যাসেট, সিডি থেকে শুরু করে বর্তমান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গানের মাধ্যম বদলালেও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের আবেদন অপরিবর্তিত রয়েছে। তাঁর কণ্ঠে প্রেম, বিচ্ছেদ, নস্টালজিয়া কিংবা একাকীত্ব—সব অনুভূতি সহজ ও সংযত ভঙ্গিতে প্রকাশ পেয়েছে। এ কারণেই তাঁর গান ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজবাস্তবতারও প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।

১৯২০ সালের ১৬ জুন বেনারসে জন্মগ্রহণ করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। পরবর্তীতে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনার সময় তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষের সঙ্গে। প্রথমদিকে তিনি লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন এবং ছোটগল্পও লিখতেন। এমনকি সাহিত্যপত্র ‘দেশ’-এ তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ ধীরে ধীরে তাঁকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়।

প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষা না থাকলেও গ্রামোফোনে গান শুনে শুনে তিনি সুর আয়ত্ত করতেন। ১৯৩৫ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও-তে অডিশনের মাধ্যমে তাঁর সংগীতজীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানি তাঁর গান প্রকাশে আগ্রহ না দেখালেও ১৯৩৭ সালে তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশিত হয়, যা তাঁর দীর্ঘ সংগীতযাত্রার ভিত্তি স্থাপন করে।

সংগীতজীবনের শুরুতে তিনি ‘ছোট পঙ্কজ’ নামে পরিচিত ছিলেন, কারণ তাঁর গায়কিতে পঙ্কজ মল্লিকের প্রভাব লক্ষ্য করা যেত। তবে সময়ের সঙ্গে তিনি নিজস্ব গায়কির ধরন গড়ে তোলেন। ১৯৪৪ সালে নিজের সুরে প্রকাশিত ‘কথা কয়ো নাকো, শুধু শোনো’ গানটি বাংলা আধুনিক গানের ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

পরবর্তী সময়ে সলিল চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর সৃজনশীল সহযোগিতা বাংলা গানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা’, ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’ প্রভৃতি গান সামাজিক বাস্তবতা ও মানুষের সংগ্রামকে তুলে ধরে। এতে প্রমাণিত হয় যে, বাংলা গান কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সময় ও সমাজের দলিল হিসেবেও কাজ করতে পারে।

বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর জুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘শাপমোচন’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠে গান দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই জুটি বাংলা সিনেমার রোমান্টিক নায়ক-ইমেজ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৫১ সালে মুম্বাইয়ে গিয়ে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রেও সাফল্য অর্জন করেন। ‘ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনী’, ‘হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা’, ‘না তুম হামে জানো’ প্রভৃতি গান তাঁকে সর্বভারতীয় পরিচিতি এনে দেয়। ‘নাগিন’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনার জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৯৭২ সালে হলিউডের ‘সিদ্ধার্থ’ চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া বাংলা গান ব্যবহৃত হয়, যা বাংলা সংগীতকে বৈশ্বিক পরিসরে পৌঁছে দেয়।

রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনেও তিনি বিশেষ স্বাতন্ত্র্য অর্জন করেন। সংযত ও আবেগঘন কণ্ঠে তিনি রবীন্দ্রনাথের গানকে সাধারণ শ্রোতার কাছে আরও সহজলভ্য করে তুলেছিলেন। তাঁর গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বাংলা সংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে।

১৯৮৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর সংগীত আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর গান নতুনভাবে আবিষ্কার করছে এবং গ্রহণ করছে।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কেবল একজন শিল্পী নন; তিনি বাংলা সংস্কৃতি, সংগীত এবং আবেগের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর সুরধারা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে আজও বেঁচে আছে।