সুরসাধনার এক মহাজ্যোতিষ্ক: ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর জীবন ও কর্ম

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সরোদ বাদক, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশ্বদূত এবং সুরসাধনার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ। ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশের) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে এক সঙ্গীতানুরাগী পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন কিংবদন্তি সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এবং মাতা ছিলেন মদিনা বেগম। পিতার সান্নিধ্যে মাইহার রাজ্যেই কেটেছে আলী আকবর খাঁর শৈশব ও কৈশোর। মাত্র তিন বছর বয়সে কণ্ঠসঙ্গীতের মাধ্যমে তাঁর আনুষ্ঠানিক সঙ্গীতশিক্ষার সূচনা হয়। তাঁর পিতা অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী ছিলেন, যার ফলে ছোটবেলা থেকেই আলী আকবর খাঁ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে তালিম গ্রহণের বিরল সুযোগ পান।

নয় বছর বয়সে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ তাঁর পুত্রের হাতে প্রথম সরোদ তুলে দেন। এর কিছুদিন পর, ১৯৩৩ সালে তাঁর চাচা ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ নিজের হাতে তৈরি একটি বিশেষ সরোদ তাঁকে উপহার দেন। এই সরোদকে সঙ্গী করেই তিনি আজীবন সুরসাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। কথিত আছে, সঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে তিনি প্রতিদিন প্রায় আঠারো ঘণ্টা রেওয়াজ করতেন, যা তাঁর অসামান্য নিষ্ঠা ও কঠোর সাধনার পরিচায়ক।

মাত্র তেরো বছর বয়সে এলাহাবাদে একটি সঙ্গীত সম্মেলনে প্রথমবারের মতো মঞ্চে সরোদ পরিবেশন করে তিনি শ্রোতা ও সমালোচকদের মুগ্ধ করেন। এরপর চল্লিশের দশক থেকে বিভিন্ন সঙ্গীত সম্মেলনে তাঁর অনন্য পরিবেশনা তাঁকে দ্রুত খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেয়। ১৯৩৮ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও-এর লক্ষ্ণৌ কেন্দ্রে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৪৩ সালে তিনি যোধপুর রাজ্যের সভাসঙ্গীতজ্ঞ নিযুক্ত হন এবং সেখানে টানা ছয় বছর অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি মুম্বাইয়ে (তৎকালীন বোম্বে) এসে চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনায় যুক্ত হন। তাঁর সুরারোপে সমৃদ্ধ উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ এবং ‘ঝিন্দের বন্দী’।

১৯৫৫ সালে বিশিষ্ট বেহালাবাদক ইহুদি মেনুহিনের আমন্ত্রণে ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ প্রথম ইংল্যান্ড এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। পাশ্চাত্যের টেলিভিশন পর্দায় প্রাচ্যের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে প্রথম যাঁরা পৌঁছে দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। একই বছরে নিউইয়র্ক থেকে তাঁর একটি লংপ্লে রেকর্ড প্রকাশিত হয়, যা আমেরিকায় প্রকাশিত প্রাচ্য সঙ্গীতের অন্যতম প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত। ১৯৬৫ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলিতে ‘আলী আকবর কলেজ অব মিউজিক’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে সান রাফায়েলে স্থানান্তরিত হয়। এছাড়া ১৯৫৬ সালে তিনি কলকাতায়ও একই নামে একটি সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং শরণার্থীদের সহায়তায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে জর্জ হ্যারিসন-এর উদ্যোগে আয়োজিত ঐতিহাসিক ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও ওস্তাদ আল্লা রাখা-এর সঙ্গে তাঁর পরিবেশিত ‘বাংলাদেশ ধুন’ আজও সঙ্গীত ইতিহাসের এক অনবদ্য সৃষ্টি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

সঙ্গীত জগতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার ওস্তাদ আলী আকবর খাঁকে ১৯৬৭ সালে ‘পদ্মভূষণ’ এবং ১৯৮৯ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি দুইবার ‘প্রেসিডেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন এবং ১৯৬১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি-এর অভিষেক অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণের বিরল সম্মান অর্জন করেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। একইভাবে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘ডক্টর অব লিটারেচার’ উপাধিতে সম্মানিত করে। ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশন তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘জিনিয়াস ফেলোশিপ’ প্রদান করে। এছাড়া ১৯৭০ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে তিনি পাঁচবার বিশ্বখ্যাত গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন।

সুরের এই মহাসাধক ২০০৯ সালের ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর জীবন ও কর্মের প্রধান প্রধান অর্জনসমূহ নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:

ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর জীবনপঞ্জি ও গুরুত্বপূর্ণ অর্জনসমূহ

সাল/সময়কালঘটনা ও অর্জিত স্বীকৃতি/পুরস্কার
১৪ এপ্রিল, ১৯২২বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের শিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ।
১৯৩৩চাচা ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর নিকট থেকে বিশেষ সরোদ উপহার লাভ।
১৯৩৮অল ইন্ডিয়া রেডিও-এর লক্ষ্ণৌ কেন্দ্রে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে যোগদান।
১৯৪৩যোধপুর রাজ্যের সভাসঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে নিযুক্তি।
১৯৫৫প্রথম পাশ্চাত্য সফর এবং নিউইয়র্ক থেকে লংপ্লে রেকর্ড প্রকাশ।
১৯৫৬কলকাতায় ‘আলী আকবর কলেজ অব মিউজিক’ প্রতিষ্ঠা।
১৯৬১মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি-এর অভিষেক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন।
১৯৬৫মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে ‘আলী আকবর কলেজ অব মিউজিক’ প্রতিষ্ঠা।
১৯৬৭ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত।
১৯৭১নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ অংশগ্রহণ।
১৯৭৪ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ।
১৯৮৯ভারত সরকার কর্তৃক সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা ‘পদ্মবিভূষণ’ লাভ।
১৯৯১মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশন কর্তৃক ‘জিনিয়াস ফেলোশিপ’ লাভ।
১৯৭০ – ১৯৯৮বিভিন্ন সময়ে মোট পাঁচবার বিশ্বখ্যাত ‘গ্র্যামি পুরস্কার’-এর জন্য মনোনয়ন লাভ।
১৮ জুন, ২০০৯মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে পরলোকগমন।

ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর অবিনশ্বর সুরধারা এবং সঙ্গীতভুবনে তাঁর অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্মকে চিরকাল মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করবে। সুরসাধক ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।