সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই আগস্ট ২০২৬, ৫:৩৪ পিএম

কণ্ঠে ছিল প্রার্থনার আকুলতা, সুরে ছিল আত্মার গভীর আর্তি। তাঁর কাওয়ালি শুনলে মনে হতো, সংগীত ধীরে ধীরে পার্থিব বাস্তবতার সীমা পেরিয়ে মানুষকে এক গভীর আত্মিক অনুভূতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শক্তিশালী কণ্ঠ, অসাধারণ স্বরনিয়ন্ত্রণ, তাৎক্ষণিক সুরসৃষ্টির দক্ষতা এবং আবেগঘন পরিবেশনার অনন্য ক্ষমতা—সব মিলিয়ে উস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান শুধু কাওয়ালির শ্রোতাদেরই মুগ্ধ করেননি, বিশ্বসংগীতের পরিসরেও নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন স্থায়ী এক আসন।
আজ তাঁর প্রয়াণের ২৯ বছর। ১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ৪৮ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। সময় পেরিয়ে গেছে প্রায় তিন দশক, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের আবেদন এতটুকুও ম্লান হয়নি। বরং নতুন প্রজন্মের শ্রোতা, শিল্পী ও সংগীতপ্রেমীদের কাছে তাঁর গান ক্রমেই নতুনভাবে আবিষ্কৃত হচ্ছে।
Table of Contents
নুসরাত ফতেহ আলী খান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৮ সালের ১৩ অক্টোবর তৎকালীন লায়ালপুরে, যা বর্তমানে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ নামে পরিচিত। তিনি এমন একটি পরিবারে জন্মেছিলেন, যার সঙ্গে কাওয়ালি পরিবেশনের প্রায় ছয় শতাব্দীর ঐতিহ্য জড়িয়ে ছিল। তাঁর বাবা উস্তাদ ফতেহ আলী খান ছিলেন কাওয়ালি ও শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশিষ্ট শিল্পী এবং শৈশবে নুসরাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক।
সংগীতের পরিবেশে বেড়ে উঠলেও শুরুতে তাঁর বাবা চাইতেন ছেলে অন্য পেশায় যাক। কিন্তু সংগীতের প্রতি নুসরাতের আকর্ষণ ছিল প্রবল। বাবার মৃত্যুর পর ১৯৬৪ সাল থেকে তিনি পারিবারিক কাওয়ালি দলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। চাচা ও পরিবারের প্রবীণ শিল্পীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ধীরে ধীরে তিনি নিজের পরিবেশনার ধরন গড়ে তোলেন।
পরবর্তীতে ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে তিনি পারিবারিক কাওয়ালি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর নিজস্ব সংগীতভাষা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও তিনি পরিবেশনায় যুক্ত করেন নতুন মাত্রা, নতুন আবেগ এবং অসাধারণ কণ্ঠনৈপুণ্য।
কাওয়ালি সুফি ভাবধারার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক ধরনের ভক্তিমূলক সংগীত। কবিতা, সমবেত কণ্ঠ, তালি, তালের পুনরাবৃত্তি, আলাপ, স্বরবিস্তার এবং ক্রমশ বাড়তে থাকা আবেগ—সব মিলিয়ে একটি কাওয়ালি ধীরে ধীরে শ্রোতাকে বিশেষ এক সংগীতমগ্নতার মধ্যে নিয়ে যায়।
নুসরাত ফতেহ আলী খান এই ঐতিহ্যকে ভেঙে দেননি; বরং তার ভেতর থেকেই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন। তাঁর পরিবেশনায় আলাপ, তান, সরগম, দ্রুত স্বরবিন্যাস এবং দীর্ঘ সময় ধরে কণ্ঠের শক্তি ধরে রাখার ক্ষমতা ছিল বিস্ময়কর। একটি পরিবেশনা অনেক সময় শান্ত ও সংযতভাবে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে তীব্রতার দিকে এগিয়ে যেত। শেষ পর্যায়ে তা রূপ নিত প্রবল আবেগময় এক সংগীত-অভিজ্ঞতায়।
তাঁর কণ্ঠে কখনো ছিল স্রষ্টার প্রতি নিবেদন, কখনো সুফি কবিতার প্রেম ও আকাঙ্ক্ষা, আবার কখনো ছিল মানুষের অন্তর্গত আবেগের তীব্র প্রকাশ। এ কারণেই তাঁর গান বুঝতে সব শব্দের অর্থ জানা জরুরি হয়ে ওঠেনি। ভাষার সীমা পেরিয়ে তাঁর কণ্ঠের আবেগ শ্রোতার কাছে পৌঁছে যেত।
নুসরাতের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি ছিল কাওয়ালিকে দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী সংগীতের পরিসর থেকে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে নিয়ে যাওয়া। ১৯৮৫ সালে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত বিশ্বসংগীত, শিল্প ও নৃত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে তাঁর পরিবেশনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক পরিচিতি তৈরি করে। এরপর ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তাঁর পরিবেশনার সুযোগ বাড়তে থাকে।
বিশ্বসংগীতের নানা শিল্পী ও প্রকল্পের সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা কাওয়ালির শ্রোতাপরিসর আরও বিস্তৃত করে। পিটার গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে তাঁর কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালির স্বকীয়তা ধরে রেখেও তিনি নতুন ধরনের সংগীত-পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁর তাৎক্ষণিক সুরসৃষ্টি, সময়জ্ঞান এবং দীর্ঘ পরিবেশনায় সংগীতের আবহ ধরে রাখার ক্ষমতা আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে বিভিন্ন দেশে ধারাবাহিক পরিবেশনার মাধ্যমে তাঁর পরিচিতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৭ সালে জাপানেও তিনি সংগীত পরিবেশন করেন। তাঁর কণ্ঠের বিস্তার ও কাওয়ালির আবেগঘন পরিবেশনা তখন এমন শ্রোতাদের কাছেও পৌঁছাতে শুরু করে, যাদের কাছে এই সংগীতধারা আগে ছিল প্রায় অপরিচিত।
নুসরাত ফতেহ আলী খানের প্রতিভা শুধু শ্রোতাদের ভালোবাসায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তিনি পেয়েছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা।
১৯৮৭ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৯৫ সালে তিনি লাভ করেন ইউনেসকো সংগীত পুরস্কার। ১৯৯৬ সালে মন্ট্রিয়ল বিশ্ব চলচ্চিত্র উৎসবে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বিশেষ সম্মাননা পান। একই বছর ফুকুওকা এশিয়ান কালচার প্রাইজের শিল্প ও সংস্কৃতি পুরস্কারেও সম্মানিত হন।
তাঁর কাজের বিস্তৃতি ছিল কাওয়ালির প্রচলিত আসরের বাইরেও। চলচ্চিত্রের সংগীত, বিশ্বসংগীতের বিভিন্ন প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী সংগীতকে নতুন শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন।
‘আফরিন আফরিন’, ‘তুমে দিল্লাগি’, ‘আল্লাহু’, ‘ইয়ে জো হালকা হালকা সুরুর হ্যায়’ এবং ‘আখিয়ান উডিক দিয়ান’-এর মতো তাঁর অসংখ্য পরিবেশনা আজও শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়। তাঁর গাওয়া সুফি কবিতা ও কাওয়ালির বহু অংশ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শিল্পী নতুনভাবে পরিবেশন করেছেন।
তাঁর প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার সীমানায় আটকে থাকেনি। পশ্চিমা সংগীতাঙ্গনের বিভিন্ন শিল্পী তাঁর কণ্ঠ, স্বরনিয়ন্ত্রণ এবং তাৎক্ষণিক সুরসৃষ্টির ক্ষমতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। বিশেষ করে বিশ্বসংগীতের শ্রোতাদের কাছে নুসরাত এমন একটি সেতু তৈরি করেছিলেন, যার এক প্রান্তে ছিল বহু শতাব্দীর সুফি সংগীত-ঐতিহ্য, আর অন্য প্রান্তে ছিল আধুনিক আন্তর্জাতিক সংগীতের বিশাল পরিসর।
তাঁর বিপুল রেকর্ডিং-ঐতিহ্যও তাঁকে সংগীতের ইতিহাসে বিশেষ অবস্থান দিয়েছে। জীবদ্দশায় তিনি অসংখ্য কাওয়ালি রেকর্ড করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও সেই রেকর্ডিংগুলো নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছেছে এবং তাঁর সংগীতকে জীবন্ত রেখেছে।
নুসরাত ফতেহ আলী খানের জীবন ছিল বিস্ময়করভাবে সংক্ষিপ্ত। ১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মাত্র ৪৮ বছরের জীবনে যে আন্তর্জাতিক প্রভাব তিনি তৈরি করেছিলেন, তা তাঁর প্রজন্মের অনেক দীর্ঘজীবী শিল্পীর অর্জনের সঙ্গেও তুলনীয়।
তাঁর আকস্মিক মৃত্যু বিশ্বসংগীত অঙ্গনে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছিল। কিন্তু তাঁর সংগীত থেমে যায়নি। তাঁর ভাতিজা রহাত ফতেহ আলী খানসহ পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীরা পারিবারিক সংগীত-ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। একই সঙ্গে নুসরাতের পুরোনো পরিবেশনাগুলোও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
আজ, ২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট, তাঁর ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়—নুসরাত ফতেহ আলী খান শুধু একজন অসাধারণ কাওয়াল ছিলেন না। তিনি ছিলেন কয়েক শতাব্দীর একটি সংগীত-ঐতিহ্যের শক্তিশালী উত্তরসূরি, যিনি সেই ঐতিহ্যকে নিজের প্রতিভা, কণ্ঠ ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিসরে নতুন পরিচয় দিয়েছিলেন।
দরগাহ ও মেহফিলের পরিসর পেরিয়ে তিনি কাওয়ালিকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বের বড় সংগীতমঞ্চে। সুফি কবিতার শব্দ তাঁর কণ্ঠে কখনো প্রার্থনা, কখনো প্রেম, কখনো আত্মার আকাঙ্ক্ষার ভাষা হয়ে উঠেছে। সেই কারণেই তাঁর সংগীতের আবেদন শুধু নির্দিষ্ট কোনো ভাষা বা অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
কণ্ঠ থেমে গেছে, মানুষটি নেই। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি এখনো বেজে চলে। নতুন শিল্পীরা তাঁর গান গাইছেন, পুরোনো শ্রোতারা তাঁর কণ্ঠে ফিরে যাচ্ছেন, আর নতুন শ্রোতারা আবিষ্কার করছেন তাঁর সংগীতের গভীরতা।
নুসরাত ফতেহ আলী খানের নাম তাই কাওয়ালির ইতিহাসে কেবল একজন শিল্পীর পরিচয় নয়। তাঁর নাম একটি দীর্ঘ সংগীত-ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক বিশ্বের সংযোগের প্রতীক। তাঁর কণ্ঠ প্রমাণ করে গেছে, সত্যিকারের সংগীতের কোনো সীমানা নেই—সুর যখন মানুষের অনুভূতিকে স্পর্শ করে, তখন তা ভাষা, ভূগোল ও সময়ের সীমা অতিক্রম করে চিরস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য