সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই আগস্ট ২০২৬, ১:৫১ এএম

কিছু মানুষকে একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। পল্লব কীর্তনিয়া তাঁদেরই একজন। তাঁকে শুধু গায়ক বললে কথাটা ঠিক হয়, কিন্তু পুরোটা বলা হয় না। তিনি গান লেখেন, সুর করেন, বই লেখেন, অভিনয় করেন, চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন। আবার তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়—তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করেছেন এবং চিকিৎসক হিসেবেও কাজ করেছেন। এই নানা পরিচয় পাশাপাশি রাখলে পল্লব কীর্তনিয়ার জীবনটাকে কিছুটা বোঝা যায়; কিন্তু তাঁকে আরও ভালোভাবে চিনতে হলে তাঁর গান শুনতে হয়। আজ ১৪ আগস্ট ২০২৬, পল্লব কীর্তনিয়ার ৬২তম জন্মদিন। এই দিনে সঙ্গীত গুরুকুলের পক্ষ থেকে তাঁকে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।
Table of Contents
পল্লব কীর্তনিয়ার জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯৬৪ সালে কলকাতায়। তাঁর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে কলকাতার Medical College and Hospital-এর সম্পর্ক রয়েছে। চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো কঠিন ও বাস্তবভিত্তিক একটি বিষয়ে পড়াশোনা করেও তিনি সৃষ্টিশীলতার জগৎ থেকে নিজেকে দূরে রাখেননি। বরং তাঁর জীবনটা যেন দুই আলাদা জগতের মধ্যে পাশাপাশি চলেছে—একদিকে হাসপাতাল, রোগী, চিকিৎসা ও বাস্তব জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা; অন্যদিকে গান, লেখা, অভিনয় ও চলচ্চিত্র। সম্ভবত এই কারণেই তাঁর শিল্পে শুধু কল্পনার জগৎ নেই; মানুষের খুব কাছাকাছি থাকা বাস্তবতাও আছে। পল্লব কীর্তনিয়াকে নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর ছাত্রজীবনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথাও এসেছে। The Times of India-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৮১ সালে Calcutta Medical College-এ পড়ার সময় তিনি নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই অভিজ্ঞতার ছাপ তাঁর চিন্তা ও সৃষ্টিতেও এসেছে। তবে সময়ের সঙ্গে তাঁর শিল্পকে কোনো একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার প্রবণতাও তাঁর কথায় দেখা যায়। এখানেই হয়তো তাঁর শিল্পীসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—তিনি নিজের সময়কে দেখেছেন, তার ভেতর দিয়ে হেঁটেছেন; কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাকে শুধু স্লোগানে পরিণত করেননি।
পল্লবের গান শুনলে মনে হয়, তিনি গানকে নিছক বিনোদনের জায়গা হিসেবে দেখেন না। তাঁর গান অনেক সময় প্রশ্ন করে—কখনও সমাজকে, কখনও সময়কে, কখনও আমাদের নিজেদের। তাঁর সংগীতজীবনের সঙ্গে ‘শাওন’, ‘ঘুমের পাতা’, ‘ধুলোখেলা’ এবং ‘মুক্তবেণী’-র মতো অ্যালবামের নাম যুক্ত। তাঁর গানের মধ্যে ‘পাতার বাসা’, ‘মানুষকে প্রাণ দেবে’, ‘তোমায় ভোট দিয়েছি বলে’, ‘এখনও গেল না আঁধার’, ‘মন আমার মাটির পরে’ এবং ‘তোমকে আছে মেঘ’-এর মতো গান বিভিন্ন সংগীত প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যায়। এই গানগুলোর বিষয় বা আবহ একরকম নয়, সেটাই স্বাভাবিক। কারণ পল্লবের সৃষ্টির জগৎও একরকম নয়। তিনি শুধু প্রেমের গান লিখবেন—এমন কোনো বাঁধাধরা নিয়ম তাঁর ক্ষেত্রে নেই; আবার শুধু প্রতিবাদী গানই করবেন—সেটিও নয়। জীবন যেমন বিচিত্র, তাঁর গানও তেমন।
পল্লব কীর্তনিয়ার আরেকটি পরিচয় লেখক হিসেবে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে ‘গানের মাটি’ (২০১২), ‘পাতার পরিজন’ (২০১৩) এবং ‘পাতার ক্যানভাস’ (২০১৪)-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। গান এবং লেখা—দুটো মাধ্যমের মধ্যে তাঁর যাতায়াতটা বেশ স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। একজন গীতিকার যখন গান লেখেন, তখন শব্দকে সুরের সঙ্গে হাঁটতে হয়। একজন লেখক যখন বই লেখেন, তখন শব্দকে একাই নিজের অর্থ বহন করতে হয়। পল্লব দুটো কাজই করেছেন। এ কারণেই তাঁর শিল্পীসত্তাকে শুধু একজন গায়কের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর কাজের একটা বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।

পল্লবের চলচ্চিত্রে আসার পেছনেও একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা ছিল—সব কথা সবসময় গান দিয়ে বলা যায় না। ২০১৪ সালে The Times of India তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণে আসার খবর প্রকাশ করে। সেখানে তাঁর ‘Daughter of Clouds’ চলচ্চিত্রের কথা বলা হয়। ছবিটিতে মা-মেয়ের সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং প্রজন্মের ব্যবধানের পাশাপাশি নকশাল আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকেও নজর দেওয়া হয়েছিল। চলচ্চিত্রটির সংগীতের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। পরে ‘মেঘের মেয়ে’-র সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত হয়। এই কাজগুলো দেখলে বোঝা যায়, তাঁর কাছে মাধ্যমটি মুখ্য নয়; বিষয়টি কীভাবে বলা যাচ্ছে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কখনও গান, কখনও লেখা, কখনও চলচ্চিত্র—একই মানুষ, কিন্তু প্রকাশের ভাষা আলাদা।
পল্লব কীর্তনিয়ার জীবনের এই দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চিকিৎসা পেশা মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেয়। অসুস্থতা, মৃত্যু, ভয়, অপেক্ষা, স্বজনের উৎকণ্ঠা—জীবনের অনেক কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হয় একজন চিকিৎসককে। অন্যদিকে একজন শিল্পীও মানুষের জীবন দেখেন, যদিও অন্য চোখে। পল্লবের ক্ষেত্রে এই দুই অভিজ্ঞতা একই জীবনে এসেছে। ২০২৪ সালে আর জি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে প্রতিবাদ তৈরি হয়েছিল, সেখানেও তাঁকে চিকিৎসক ও শিল্পী—দুই পরিচয়েই দেখা গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাঁর সেই অংশগ্রহণের কথা প্রকাশ করেছে। ঘটনাটি তাঁর জীবনকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ এতে তাঁর দুটি পরিচয় পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়। তিনি শুধু গান করেননি; নিজের পেশা ও সমাজের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন।
পল্লব কীর্তনিয়ার রাজনৈতিক চিন্তা বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে সবার মত এক হবে—এমন কথা বলার কারণ নেই। কিন্তু একজন শিল্পীর সঙ্গে একমত হওয়া আর তাঁর কাজকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা—এ দুটি আলাদা ব্যাপার। একজন শিল্পী এমন কিছু প্রশ্ন তুলতে পারেন, যার সঙ্গে আমরা একমত নই; তবু সেই প্রশ্ন আমাদের ভাবাতে পারে। পল্লবের কাজের দিকে তাকালে এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। তিনি তাঁর সময়কে এড়িয়ে যাননি, নিজের অভিজ্ঞতাকে লুকিয়ে রাখেননি, আবার নিজের শিল্পকেও একমাত্রিক করে ফেলেননি।
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হয়তো নেই। বাংলা গান এত বড় একটি জগৎ যে সেখানে প্রত্যেক শিল্পীকে কোনো একটি ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া কঠিন। পল্লব কীর্তনিয়াকেও তাই নির্দিষ্ট কোনো ধারার শিল্পী বলে শেষ করে দেওয়া ঠিক হবে না। তাঁর মধ্যে singer-songwriter-এর স্বাধীনতা আছে, আছে কবিতার প্রতি টান, আছে সামাজিক প্রশ্ন, আছে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আছে চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ, আর আছে জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে দীর্ঘ পরিচয়। এই সবকিছুর যোগফলই পল্লব কীর্তনিয়া।
জন্মদিনে আমরা সাধারণত সাফল্যের হিসাব করি—কত গান, কত অ্যালবাম, কত পুরস্কার। কিন্তু সব শিল্পীকে এভাবে মাপা যায় না। কিছু শিল্পীর গুরুত্ব সংখ্যায় ধরা পড়ে না; তাঁদের গুরুত্ব থাকে তাঁদের নিজস্ব স্বরে। পল্লব কীর্তনিয়ার ক্ষেত্রেও কথাটা প্রযোজ্য। তিনি বাংলা গানের মূলধারার সবচেয়ে বড় তারকাদের তালিকায় থাকবেন কি না, সেটা হয়তো আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু নিজের মতো করে গান লেখা ও গাওয়ার যে স্বাধীনতা, নিজের সময়কে নিজের চোখে দেখার যে সাহস—সেই জায়গায় তাঁর একটি আলাদা পরিচয় আছে। আর শিল্পের ইতিহাসে এই স্বতন্ত্রতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আমাদের সময়ে শিল্পীকে দ্রুত শ্রেণিবদ্ধ করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কে গায়ক, কে গীতিকার, কে সামাজিক কর্মী, কে চলচ্চিত্র নির্মাতা—সবকিছুর আলাদা পরিচয় চাই। পল্লব কীর্তনিয়ার জীবন সেই সরল বিভাজনকে একটু কঠিন করে দেয়। তিনি একসঙ্গে অনেক কিছু, এবং হয়তো সেটাই স্বাভাবিক। মানুষ যেমন এক জীবনে অনেক রকম হয়, শিল্পীও তেমন। একদিন তিনি চিকিৎসক, আরেকদিন গানের মানুষ; কখনও লেখক, কখনও চলচ্চিত্র নির্মাতা, কখনও নিজের সময়ের একজন সচেতন নাগরিক। এই বহুমাত্রিক মানুষটিকেই আমাদের মনে রাখা উচিত।
পল্লব কীর্তনিয়ার ৬২তম জন্মদিনে সঙ্গীত গুরুকুলের পক্ষ থেকে তাই শুধু ‘শুভ জন্মদিন’ বলেই থামতে চাই না। তাঁর গানগুলো আবার শুনতে চাই, তাঁর লেখা আবার পড়তে চাই, তাঁর চলচ্চিত্রের দিকে আবার ফিরে তাকাতে চাই এবং দেখতে চাই, একজন শিল্পী কীভাবে নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতাকে সৃষ্টির ভেতরে নিয়ে আসেন। বাংলা গানকে বড় করে তোলে শুধু বড় বড় নাম নয়; এমন অনেক স্বতন্ত্র কণ্ঠও বাংলা সংগীতের ভুবনকে সমৃদ্ধ করে, যাঁরা নিজের মতো করে পথ চলেন। পল্লব কীর্তনিয়া তাঁদেরই একজন।
৬২তম জন্মদিনে পল্লব কীর্তনিয়াকে সঙ্গীত গুরুকুলের পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা। আপনার গান থাকুক, আপনার প্রশ্ন থাকুক, আপনার নিজের মতো করে কথা বলার সাহসটুকুও থাকুক।
শুভ জন্মদিন, পল্লব কীর্তনিয়া।
— সঙ্গীত গুরুকুল

মন্তব্য