সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই অক্টোবর ২০২২, ১:৩৪ পিএম

বাঙালি সংগীতের আকাশে আঁখি আলমগীর এমন এক দেদীপ্যমাণ নক্ষত্র, যিনি কেবল গায়কী দিয়ে নন, বরং তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভা, মোহনীয় স্টেজ পারফরম্যান্স এবং অনবদ্য ব্যক্তিত্ব দিয়ে জয় করেছেন কোটি শ্রোতার হৃদয়। তিনি একাধারে গায়িকা, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী এবং একজন সফল উপস্থাপিকা। প্রায় তিন দশক ধরে বাংলাদেশের বিনোদন জগতে নিজের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন এই গুণী শিল্পী।
Table of Contents
১৯৭৫ সালের ৭ই জানুয়ারি ঢাকার এক বনেদি সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্ম নেন আঁখি আলমগীর। তাঁর ধমনিতে বইছে খাঁটি শিল্পীর রক্ত। তাঁর পিতা আলমগীর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সেরা রোমান্টিক ও প্রভাবশালী অভিনেতা, আর মাতা খোশনূর আলমগীর ছিলেন একজন প্রথিতযশা গীতিকার। জন্মসূত্রে আঁখির আদি পৈতৃক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলায়, যা ঐতিহাসিকভাবেই সুর ও সংস্কৃতির উর্বর ভূমি হিসেবে পরিচিত।
পারিবারিক আবহের কারণেই ছোটবেলা থেকেই সুর আর অভিনয়ের চাদরে মোড়ানো ছিল তাঁর চারপাশ। পরবর্তীতে পিতা আলমগীরের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হলে, উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা আঁখির জীবনে আসেন মা হিসেবে। ফলে দুই কিংবদন্তির ছায়ায় আঁখির সংগীত ও জীবনবোধ আরও পরিপক্ব হয়ে ওঠে।
আঁখি আলমগীরের ক্যারিয়ারের শুরুটা গান দিয়ে নয়, হয়েছিল অভিনয় দিয়ে; এবং তাও আবার এক ঐতিহাসিক রাজকীয় অভিষেক! ১৯৮৪ সালে প্রখ্যাত পরিচালক আমজাদ হোসেনের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘ভাত দে’-তে কিশোরী ‘জরি’ চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। দরিদ্র, ক্ষুধার্ত এক কিশোরীর আকুতি তিনি তাঁর চোখের ভাষায় এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে, প্রথম অভিনয়েই বাজিমাত করেন। শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী হিসেবে তুলে নেন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’।
শৈশবে অভিনয় দিয়ে আকাশছোঁয়া খ্যাপন পেলেও আঁখির মন পড়ে ছিল সুরের মায়াজালে। দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময়, ১৯৯৪ সালে ‘বিদ্রোহী বধূ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে তাঁর পেশাদার সংগীত জীবনের খাতা খোলেন।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৯৬ সালে প্রখ্যাত সুরকার আলাউদ্দিন আলীর সুরে ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি মূলধারার সংগীতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম একক গানের অ্যালবাম ‘প্রথম কলি’। তবে আঁখিকে তুমুল জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয় ১৯৯৮ সালের মেগা-হিট অ্যালবাম ‘বিষের কাঁটা’। এই অ্যালবামের “বন্ধু আমার রসিয়া” এবং “পিরীতি বিষের কাঁটা” গান দুটি তৎকালীন তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে রাতারাতি লোকপ্রিয় সংগীতে পরিণত হয়। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তাঁর ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে ১৯টি সফল একক গানের অ্যালবাম।
দীর্ঘ ২০ বছর পর আঁখি আলমগীর আবার আধুনিক ও লোকজ ধারার মেলবন্ধনে শ্রোতাদের চমকে দেন। প্রখ্যাত সুরকার আলাউদ্দিন আলীর সুরে বাংলা ঢোলের ব্যানারে তিনি কণ্ঠ দেন “বৈশাখী মেলা” গানে। শুধু গান গাওয়াই নয়, এক বিশাল বাজেটের জমকালো মিউজিক ভিডিওতে ৩২ জন নৃত্যশিল্পীর সাথে ডাইনামিক পারফরম্যান্স করে তিনি প্রমাণ করেন যে কেন তাঁকে বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সেরা ‘স্টেজ পারফর্মার’ বলা হয়।
এছাড়াও তাঁর কণ্ঠে কবির বকুলের কথা ও শওকত আলী ইমনের সুরে “ফাল্গুনে কৃষ্ণচূড়া” গানটি বেশ প্রশংসিত হয়। একটি দারুণ পারিবারিক ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হয় যখন আঁখি তাঁর পিতা আলমগীর পরিচালিত ‘একটি সিনেমার গল্প’ চলচ্চিত্রের জন্য গান রেকর্ড করেন। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা সেই গানটির সুর করেছিলেন আঁখির সৎ মা রুনা লায়লা। রুনা লায়লার সুরারোপিত প্রথম গানে আঁখির কণ্ঠ দেওয়াটা ছিল পুরো পরিবারের জন্য এক পরম প্রাপ্তি।
আজকের দিনেও আঁখি আলমগীর মানেই স্টেজে এক জীবন্ত অগ্নিকুণ্ড। দেশ এবং দেশের বাইরে শত শত লাইভ কনসার্টে তাঁর উপস্থিতি মানেই দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়। গায়িকা হিসেবে তিনি যতটা সফল, একজন আধুনিক নারী ও মা হিসেবেও তিনি ততটাই অনুকরণীয়। স্টেজ, টেলিভিশন স্ক্রিন কিংবা প্লেব্যাক—সবখানেই আঁখি আলমগীর তাঁর চিরচেনা হাসি আর জাদুকরী কণ্ঠ নিয়ে সগৌরবে রাজত্ব করে চলেছেন।
মন্তব্য