বাঙালির মজ্জায় মজ্জায় জড়িয়ে আছে লোকজ সুরের টান। কিন্তু সেই সুরের সাথে প্রখর রসবোধ, সমসাময়িক সমাজের অসঙ্গতি আর নিখুঁত ছন্দের মেলবন্ধন ঘটিয়ে যিনি এদেশের আপামর শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন, তিনি নকুল কুমার বিশ্বাস। আশির দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের সোনালী দিনগুলোতে গ্রাম থেকে শহর—সবখানে বেজেছে তাঁর গান। ছন্দে ছন্দে কথা বলা, যেকোনো কঠিন বিষয়কে নিমিষে গানের পঙ্ক্তিতে রূপ দেওয়া আর একই সাথে ডজনখানেক বাদ্যযন্ত্রের ওপর জাদুকরী দখল রাখা—সব মিলিয়ে নকুল কুমার বিশ্বাস বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এক দারুণ একাকী প্রতিষ্ঠান।

Table of Contents
শৈশব ও মেজভাইয়ের হাত ধরে যাত্রাদলে যাত্রা
১৯৬৫ সালে মাদারীপুর জেলার পূর্ব কলাগাছিয়া গ্রামের এক সঙ্গীতমুখর পরিবারে জন্ম নেন নকুল কুমার বিশ্বাস। বাবা সুরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস এবং মা মঙ্গলী দেবীর পাঁচ ভাই ও এক বোনের সংসারে তিনি ছিলেন পঞ্চম। বাড়িতে সারাক্ষণ গানের আবহ থাকায় সুরের প্রতি এক অমোঘ টান তৈরি হয়েছিল তাঁর।
তাঁর সঙ্গীতজীবনের আনুষ্ঠানিক শুরুটা হয়েছিল এক বড় রোমাঞ্চের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৫ সাল, বয়স তখন মাত্র দশ বছর। মেজভাই হীরালাল বিশ্বাসের হাত ধরে গোপালগঞ্জের বিখ্যাত যাত্রাদল ‘দীপালি অপেরা’-তে শিশুশিল্পী হিসেবে অডিশন দিতে যান তিনি। ছোট্ট আঙুলের ডগা দিয়ে হারমোনিয়ামের রিডে সুর তুলে এমন মিষ্টি কণ্ঠে একের পর এক গান শুনিয়েছিলেন যে, উপস্থিত বিচারক থেকে শুরু করে সবাই অবাক বনে গিয়েছিলেন। সুযোগ মিলেছিল সেই যাত্রাদলে, আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক যাযাবর সুরশিল্পীর পথচলা।
পকেটে ৫০০ টাকা নিয়ে পণ্ডিত রবিশঙ্করের খোঁজে
মাদারীপুরের ওস্তাদ রণজিৎ দাইয়ের কাছে হারমোনিয়ামে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নেন নকুল। মাত্র ছয় মাসেই কঠিন সব রাগ আয়ত্ত করে তিনি একটি স্কুলের প্রধান হারমোনিয়াম মাস্টার হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। তবে তাঁর স্বপ্নের পরিধি ছিল অনেক বড়। গুরু আশু মিয়ার কাছে বিশ্ববিখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্করের গল্প শুনে তাঁর মনে তীব্র জেদ চাপে—তাঁকেও রবিশঙ্করের মতোই বড় সেতারবাদক হতে হবে।
১৯৮০ সালে সেই স্বপ্নের টানে পকেটে মাত্র ৫০০ টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে সুদূর কলকাতায় পাড়ি জমান কিশোর নকুল। কলকাতায় গিয়ে প্রখ্যাত সেতারবাদক ওস্তাদ মোস্তাক আলী খানের নাতি-শিষ্য শ্রী রণজিৎ বিশ্বাসের সন্ধান পান এবং তাঁর কাছে কিছুদিন সেতারের ব্যাকরণ শেখেন। সাধনা শেষে ২৮০ টাকা দিয়ে একটি সেতার কিনে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরে আসেন তিনি। এলাকায় ফিরেই শুরু হয় সেতার বাজানো, গান, অভিনয় আর নাচ দিয়ে মানুষের মন জয় করার পালা।
ভাঙা বারান্দার আশ্রয় থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মঞ্চ
শিল্পী হওয়ার অদম্য বাসনা নিয়ে ১৯৮৩ সালে ঢাকায় আসেন নকুল কুমার বিশ্বাস। ঢাকায় চেনা কেউ ছিল না, আশ্রয় মেলে ওস্তাদ আমানউল্লাহ খানের বাড়ির একটা ভাঙা বারান্দায়। বিনিময়ে ওস্তাদের কাছ থেকে নিতেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের দীক্ষা।
সে বছরই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এক আসরে এককভাবে হারমোনিয়াম বাজানোর এক অভাবনীয় সুযোগ পান তিনি। তাঁর সেই অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ হন উপস্থিত সুধীজন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি, শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নকুলের প্রতিভা দেখে এতটাই আপ্লুত হয়েছিলেন যে, কেন্দ্রের ফান্ড থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এক হাজার টাকা পুরস্কার দেন। এরপর বাংলাদেশ বেতারে স্থায়ীভাবে যন্ত্র ও সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে চাকরি পান নকুল। কিন্তু বাঁধাধরা সরকারি চাকরিতে তাঁর স্বাধীনচেতা মন টেকেনি।
কবিয়ালের ওপর অভিমান এবং গীতিকার নকুল
১৯৮৬ সালে নকুল আবার গ্রামে ফিরে যান এসএসসি পরীক্ষা দিতে। তখন তিনি এক স্থানীয় কবিয়ালের গান সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই কবিয়াল গান দিতে অস্বীকৃতি জানালে তরুণের মনে তীব্র অভিমান হয়। তিনি মনে মনে জেদ ধরেন—কারো কাছে আর গানের জন্য হাত পাতবেন না। সেই থেকে নিজেই গান লেখা শুরু করেন এবং আজ অবধি নকুল কুমার বিশ্বাস নিজের লেখা ছাড়া অন্য কারো গান কখনো কণ্ঠে তোলেননি।
এসএসসি পাস করে ১৯৮৭ সালের রোজার ঈদে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘কনকর্ড এন্টারপ্রাইজ’-এর ব্যানারে রিলিজ হয় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘কনকর্ড ভলিউম-১’ (যার মূল গান ছিল ‘ভাগবত পড়ে ভগবানকে পাইছোনি’)। অ্যালবামটি বাজারে আসতেই সুপারহিট হয়।
‘ইত্যাদি’র সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এবং ওপার বাংলায় নকুল-ঝড়
নকুল কুমার বিশ্বাসের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট আসে ১৯৯৬ সালে, হানিফ সংকেতের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-র হাত ধরে। ইত্যাদির মঞ্চে তাঁর গাওয়া সামাজিক ব্যঙ্গাত্মক গান ‘বিয়া করলাম ক্যানরে দাদা, বিয়া করলাম ক্যান’ প্রচারিত হওয়া মাত্রই দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এই একটি গান তাঁকে রাতারাতি কোটি মানুষের প্রিয় শিল্পীতে পরিণত করে। এরপর টানা দশ বছর তিনি ইত্যাদির পর্দায় নিয়মিত জীবনমুখী গান নিয়ে হাজির হয়েছেন।
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে ওপার বাংলাতেও নকুলের গানের তুমুল জোয়ার আসে। কলকাতার নামী অডিও কোম্পানি ‘জেএমডি’ থেকে ২০০১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অ্যালবাম ‘নদীয়ান নকুল’ এবং ২০০৩ সালে এএসডি অডিও কোম্পানির ব্যানারে বের হয় বিখ্যাত অ্যালবাম ‘চাকরি নাই বুড়ো বাবার’। ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে এযাবৎ তাঁর প্রায় অর্ধশতেরও বেশি একক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে।
বহুমাত্রিক যন্ত্রশিল্পী ও ‘ছন্দ আনন্দ’-এর ইতিহাস
নকুল কুমার বিশ্বাস কেবল একজন গায়ক নন, তিনি একজন সত্যিকারের ‘মাল্টি-ইনস্ট্রুমেন্টালিস্ট’। গানের পাশাপাশি তিনি সেতার, তবলা, বাঁশি, সরোদ, সন্তুর, দোতারা এবং ম্যান্ডোলিনসহ আরও নানা রকম কঠিন বাদ্যযন্ত্র বাজানোতে ভীষণ পারদর্শী। বিশেষ করে হারমোনিয়াম বাজানোতে তাঁর দক্ষতা কিংবদন্তিতুল্য।
টেলিভিশনের পর্দায় তিনি নিয়ে আসেন এক অভাবনীয় শো—‘ছন্দ আনন্দ’। এটি ছিল গোটা উপমহাদেশের প্রথম এমন একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, যার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো স্ক্রিপ্ট, উপস্থাপনা ও সংলাপ সাজানো হয়েছিল নিখুঁত ছন্দের মাধ্যমে। ছন্দের এই নতুন জাদু দর্শকদের এত ভালো লেগেছিল যে, টেলিভিশন রেটিং পয়েন্টে (TRP) এটি দীর্ঘদিন প্রথম স্থান দখল করে রেখেছিল।

ব্যক্তিগত জীবন ও উপসংহার
সংসার জীবনে নকুল কুমার বিশ্বাস ভীষণ সুখী একজন মানুষ। স্ত্রী এবং দুই সন্তান—ছেলে পলক কুমার বিশ্বাস ও মেয়ে প্রত্যাশা বিশ্বাসকে নিয়ে তাঁর ছিমছাম সংসার।
নকুল কুমার বিশ্বাস এদেশের সঙ্গীতজগতের এমন এক প্রদীপ্ত নক্ষত্র, যিনি কোনো কর্পোরেট চটক বা আধুনিক ওয়েস্টার্ন হাইপের ওপর ভর করে চলেননি। তিনি হেঁটেছেন মাটির রাস্তা দিয়ে, মানুষের যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখ, অভাব-অনটনকে ছন্দের জাদুতে রূপ দিয়েছেন। যতদিন বাংলা লোকসঙ্গীত এবং জীবনমুখী গানের চর্চা থাকবে, এদেশের শ্রোতারা ছন্দের এই জাদুকরকে পরম ভালোবাসায় মনে রাখবে।
