হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দরবারে মারবা ঠাটের অন্তর্গত ‘রাগ মালীগৌরা’ (বা মালিগৌরা) এক অত্যন্ত চমৎকার, গম্ভীর এবং জটিল প্রকৃতির রাগ। এই রাগটির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর ভেতরে দুটি শক্তিশালী রাগ—‘পুরিয়া’ এবং ‘শ্রী’-এর এক অপূর্ব ও সুনিপুণ মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়।
Table of Contents
রাগ মালীগৌরা: পুরিয়া আর শ্রী রাগের মিশ্রণে এক অনিন্দ্য সুন্দর সুরের রূপরেখা
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জগতে কিছু রাগ আছে যা তার জটিল স্বরবিন্যাস এবং দুটি ভিন্ন রাগের ছায়ার কারণে সঙ্গীতবোদ্ধাদের কাছে এক পরম বিস্ময়। ‘রাগ মালীগৌরা’ তেমনই এক অনন্য রাগ। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে এটি মারবা ঠাটের অন্তর্গত একটি বিশেষ রাগ।
এই রাগের চলনে একাধারে রাগ পুরিয়া এবং রাগ শ্রী-এর এক অপূর্ব মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনেক পণ্ডিতের মতে, রাগ পুরিয়ার সাথে যদি ‘পঞ্চম’ (পা) স্বরটি ব্যবহার করা হয়, তবেই মালীগৌরা রাগের রূপটি চমত্কারভাবে ফুটে ওঠে।
স্বরের কারুকাজ ও রূপভেদ
এই রাগে ধৈবতের ব্যবহার অত্যন্ত চমৎকার। রাগে যখন শুদ্ধ ধৈবত ব্যবহার করা হয়, তখন এর মধ্যে ‘রাগ শ্রী’-এর আবহ তৈরি হয়। আবার যখন কোমল ধৈবত ব্যবহার করা হয়, তখন এর মধ্যে ‘রাগ পুরিয়া’-র প্রাধান্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই রাগের গায়কী বা বিস্তারের ক্ষেত্র মূলত মন্দ্র এবং মধ্য সপ্তকেই বেশি লক্ষ্য করা যায়।
বাদী ও সমবাদী স্বর নিয়ে মতভেদ
চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী এই রাগে গান্ধার (গা)-কে বাদী স্বর হিসেবে মানা হলেও, পণ্ডিত ভাতখণ্ডেজি তাঁর বিখ্যাত ‘ক্রমিক পুস্তক মালিকা’-য় এই রাগের বাদী স্বর হিসেবে ঋষভ (রে) স্বরটিকে উল্লেখ করেছেন।
রাগ মালীগৌরা-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী এই রাগের মূল কাঠামোটি নিচে তুলে ধরা হলো:
- ঠাটের পরিচয় (Thaat): রাগটি মারবা ঠাটের অন্তর্গত।
- জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ। অর্থাৎ, এর আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি স্বরই ব্যবহৃত হয়।
- বাদী স্বর (Vadi Swar): গান্ধার (গা) (তবে পণ্ডিত ভাতখণ্ডেজির মতে: ঋষভ)।
- সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): ধৈবত (ধা)।
- অঙ্গ (Anga): এটি একটি পূর্বাঙ্গ প্রধান রাগ।
- পরিবেশনের সময় (Time): এই রাগ গাওয়ার বা বাজানোর আদর্শ সময় হলো সায়ংকাল (সন্ধ্যাবেলা)।
আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়
রাগের সেই বিশেষ গম্ভীর চলন এবং স্বরের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য এর নিখুঁত স্বরলিপি নিচে দেওয়া হলো:
আরোহণ: ন্ ঋ গ, হ্ম প, হ্ম দ প, হ্ম দ র্স
অবরোহণ: র্স ন ধ, ন, ন ধ, প, হ্ম ধ হ্ম গ, ঋ স
পকড়: ন্ ঋ গ, হ্ম দ প, হ্ম ধ হ্ম গ, ঋ – স
(নোট: এখানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের নিয়ম অনুযায়ী ‘হ্ম’ দিয়ে তীব্র মধ্যম এবং ‘দ’ দিয়ে কোমল ধৈবত বা শুদ্ধ স্বরের চলন প্রকাশ করা হয়েছে।)
তথ্যসূত্র
এই রাগের তাত্বিক ও ক্রিয়াত্মক পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণের জন্য প্রখ্যাত সঙ্গীত গবেষক শক্তিপদ ভট্টাচার্য রচিত এবং ১৫ এপ্রিল ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত ‘উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত’ গ্রন্থটির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

রাগ মালীগৌরা তার দ্বৈত প্রকৃতির কারণে সাধারণ রাগের চেয়ে কিছুটা কঠিন, তবে এর শান্ত ও গম্ভীর পরিবেশ সন্ধ্যাবেলার স্নিগ্ধ আবহে শ্রোতার মনে এক অন্যরকম আধ্যাত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়।
মারবা ঠাটের এই অনন্য রাগটি নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজনটি আপনার কেমন লাগল, তা আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে সঙ্গীতপ্রেমী বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
