সংগীতপ্রেমীদের কাছে সুরের সুধা উপভোগ করার জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট দিন বা ক্ষণের প্রয়োজন হয় না। বছরের ৩৬৫ দিন এবং ২৪ ঘণ্টাই গান মানুষের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হিসেবে বিরাজ করে। তবুও সংগীতের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা, গভীর ভালোবাসা এবং বিশ্বব্যাপী সুরের শক্তিকে উদ্যাপন করতে প্রতিবছর একটি বিশেষ দিনকে উৎসর্গ করা হয়। আজ ২১ জুন সেই বহুল প্রতীক্ষিত ‘বিশ্ব সংগীত দিবস’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবছর নানা বর্ণাঢ্য ও আকর্ষণীয় কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই দিবসটি উদ্যাপিত হয়ে থাকে। কোথাও খোলা আকাশের নিচে জমকালো কনসার্ট, কোথাও শোভাযাত্রা, আবার কোথাও বা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দিনটি স্মরণ করা হয়। সংগীতের সুর লহরীর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, শান্তি ও ইতিবাচক চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে দেওয়াই এই দিবসের মূল ও প্রধান লক্ষ্য।
বিশ্ব সংগীত দিবসের সূচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ২১ জুন তারিখে সংগীত দিবস উদ্যাপিত হলেও এর পেছনে রয়েছে এক আকর্ষণীয় ইতিহাস। অনেকের মতে, এই দিবসের মূল ভাবনাটি প্রথম আসে ১৯৭৬ সালে। সে সময় ফ্রান্সে কর্মরত মার্কিন সংগীতশিল্পী জোয়েল কোহেন ‘সামার সোলস্টাইস’ বা বছরের দীর্ঘতম দিন তথা গ্রীষ্মের আগমনকে উদ্যাপন করার লক্ষ্যে সারা রাত ধরে গান বাজিয়ে যাওয়ার একটি অভিনব প্রস্তাব করেন। পরবর্তীতে এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ১৯৮১ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন সংস্কৃতিমন্ত্রী জ্যাক ল্যাং প্রথম একটি নির্দিষ্ট সংগীত দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করার চিন্তা শুরু করেন।
ফ্রান্সের প্রথাগত গানের ধারাকে ভেঙে নতুনত্ব আনার জন্য জ্যাক ল্যাং সে দেশের বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ মরিস ফ্লুরেটকে নিয়োগ দেন। ফ্লুরেট ১৯৮২ সালে একটি ব্যাপকভিত্তিক পরিসংখ্যান ও জরিপ পরিচালনা করেন। সেই জরিপে উঠে আসে যে, ফ্রান্সে প্রতি দুজন তরুণের মধ্যে একজন কোনো না কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারদর্শী। এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ১৯৮২ সালের ২১ জুন ফ্রান্সে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’ (Fête de la Musique) বা ‘মেক মিউজিক ডে’ নামের বিশেষ এই দিনটির উদ্যাপন শুরু হয়। জ্যাক ল্যাং, প্রকৌশলী ক্রিস্টিয়ান ডুপাভিলন এবং মরিস ফ্লুরেটের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তরুণদের জন্য চিরাচরিত সংগীতের পাশাপাশি রক, জ্যাজ ও পপের মতো আধুনিক ধারাগুলো শেখার নতুন পথ উন্মোচিত হয়। বর্তমানে আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, লুক্সেমবার্গ, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, কোস্টারিকাসহ বিশ্বের প্রায় ১২০টি দেশ ও ৪৫০টিরও বেশি শহরে এই দিবসটি বিপুল উৎসাহের সাথে উদ্যাপিত হচ্ছে। এই দিনে বিভিন্ন দেশের রেস্তোরাঁ, পার্ক, রাস্তা ও যানবাহনে শিল্পীরা সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে গান পরিবেশন করেন।
বিশ্ব সংগীত দিবসের ঐতিহাসিক পটভূমি, বিস্তার এবং ২০২৬ সালের বিশেষ আয়োজনের বিবরণ নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| দিবসের ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক সূচক | বিস্তারিত তথ্য ও ফ্যাক্টস |
| দিবসের নাম ও উদ্যাপনের তারিখ | বিশ্ব সংগীত দিবস; ২১ জুন |
| প্রাথমিক ধারণা ও প্রস্তাবক | ১৯৭৬ সাল; মার্কিন সংগীতশিল্পী জোয়েল কোহেন |
| প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও প্রবক্তা | ১৯৮১-৮২ সাল; ফ্রান্সের সংস্কৃতিমন্ত্রী জ্যাক ল্যাং ও মরিস ফ্লুরেট |
| ফরাসি নাম ও বৈশ্বিক বিস্তার | ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’; প্রায় ১২০টি দেশ ও ৪৫০টি শহর |
| বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজন | ২১ ও ২২ জুন (দুই দিনব্যাপী সংগীত উৎসব) |
| উদ্বোধনী দিনের প্রধান অতিথি (২১ জুন) | সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী |
| দ্বিতীয় দিনের প্রধান অতিথি (২২ জুন) | তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন |
| সংগঠন সমন্বয় পরিষদের আয়োজন | কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা মিলনায়তন (সেগুনবাগিচা) |
| বিশেষ টেলিভিশন অনুষ্ঠান | মাছরাঙা টিভিতে ‘সংস অব বেঙ্গল: প্রাণবন্ধের সনে’ (রাত ৮:৩০) |
বাংলাদেশে বিশ্ব সংগীত দিবসের নানামুখী আয়োজন
এ বছর ২০২৬ সালের বিশ্ব সংগীত দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের সংগীতচর্চার বহুমাত্রিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় দুই দিনব্যাপী এক বর্ণাঢ্য ‘সংগীত উৎসব’-এর আয়োজন করেছে। আজ ২১ জুন সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। উৎসবের প্রথম দিনে দেশবরেণ্য ১০ জন কণ্ঠশিল্পী দেশের গান পরিবেশন করবেন। আমন্ত্রিত শিল্পীদের তালিকায় রয়েছেন কণ্ঠশিল্পী আগুন, ফাহমিদা নবী, মিতা খন্দকার, মনির খান, অনিমা রায়, শফি মণ্ডল এবং আলিফ আলাউদ্দিন। এছাড়া বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে বাংলাদেশে অবস্থিত চীন ও জাপান দূতাবাসের আমন্ত্রিত শিল্পীরাও এই মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করবেন।
আগামীকাল ২২ জুন সোমবার উৎসবের দ্বিতীয় দিনে একই সময়ে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিট থেকে শুরু হবে মূল সংগীত সন্ধ্যার নান্দনিক পরিবেশনা।
পাশাপাশি বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদের উদ্যোগে রাজধানীর সেগুনবাগিচার কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা মিলনায়তনে দুই দিনব্যাপী পৃথক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। আজ বিকেল ৪টায় বেলুন ওড়ানো, উদ্বোধনী সংগীত ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী ও সংস্কৃতিজন আশরাফুল আলম এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত সুরকার শেখ সাদী খান। আলোচনা সভা শেষে বিকেল ৫টা থেকে সমন্বয় পরিষদের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা দলীয় ও একক পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে হাজির হবেন। পরদিন ২২ জুন অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশিষ্ট শিল্পী আকরামুল ইসলাম, যার পর যথারীতি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালিত হবে।
গণমাধ্যমে বিশেষ সম্প্রচার: ‘সংস অব বেঙ্গল’
টেলিভিশন গণমাধ্যমেও বিশ্ব সংগীত দিবসকে কেন্দ্র করে বিশেষ অনুষ্ঠানের সূচি রাখা হয়েছে। আজ রাত ৮টা ৩০ মিনিটে মাছরাঙা টেলিভিশনে প্রচারিত হবে হাসন রাজার গান ও জীবনদর্শনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত বিশেষ মিউজিক্যাল শো ‘সংস অব বেঙ্গল: প্রাণবন্ধের সনে’। মরমি কবি হাসন রাজার সৃষ্টি ও দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
এই বিশেষ অনুষ্ঠানটির সংগীত পরিচালক ও কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী শায়ান চৌধুরী অর্ণব। তাঁর নিজস্ব শিল্পভাবনা ও আধুনিক সংগীতবিন্যাসে হাসন রাজার চিরন্তন গানগুলো একটি সম্পূর্ণ নতুন ও আকর্ষক আবহে দর্শকদের সামনে পরিবেশিত হবে। ‘এম ডব্লিউ ম্যাগাজিন বাংলাদেশ’ এবং স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যবিষয়ক ব্র্যান্ড ‘মায়া’ যৌথভাবে এই সৃজনশীল অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে, যা সংগীতের চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতাকে অনন্য মাত্রায় ফুটিয়ে তুলবে।
