সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই আগস্ট ২০২৬, ৫:৬ পিএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে দুই দিনের ব্যবধানে দুটি কনসার্ট বাতিলের ঘটনায় দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনুষ্ঠান আয়োজনের স্বাধীনতা, শিল্পী ও আয়োজকদের নিরাপত্তা, প্রশাসনের দায়িত্ব এবং স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মধ্যে ভারসাম্য—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংগীতশিল্পী, সুরকার ও আয়োজকেরা। তাঁদের বক্তব্য, কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে আপত্তি থাকলে তা শেষ মুহূর্তে বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে আগে থেকেই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের পথ বের করা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা শিল্পীদের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, নিয়ম মেনে আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়ার পরও যদি শেষ মুহূর্তে কোনো অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আয়োজকেরা নতুন অনুষ্ঠান পরিকল্পনায় অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। এতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পী ও অনুষ্ঠানসংশ্লিষ্ট বহু মানুষের আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একটি কনসার্টের আয়োজন শুধু মঞ্চে শিল্পীর পরিবেশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন যন্ত্রশিল্পী, শব্দ ও আলোকসজ্জাকর্মী, মঞ্চ নির্মাণকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, পরিবহনকর্মী, প্রচারকর্মী, অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপক ও স্থানীয় বিভিন্ন সেবাদাতা। অনুষ্ঠান হওয়ার অনেক আগেই মঞ্চ, শব্দব্যবস্থা, আলো, পরিবহন, প্রচার এবং অন্যান্য খাতে অর্থ ব্যয় করা হয়। শেষ মুহূর্তে আয়োজন বাতিল হলে সেই অর্থের বড় অংশ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে ক্ষতির প্রভাব শিল্পী বা আয়োজকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
প্রবীণ সুরকার ও সংগীতজ্ঞ শেখ সাদী খান মনে করেন, সংস্কৃতিকে কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা বিশেষ মহলের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আটকে রাখা উচিত নয়। তাঁর মতে, একটি জাতির পরিচয়, ইতিহাস ও সামাজিক বন্ধনের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক গভীর। গান, সাহিত্য, নাটক, লোকসংগীত ও অন্যান্য শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন, অনুভূতি ও ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ টেনে শেখ সাদী খান বলেন, সংগীতের জন্য পরিচিত একটি অঞ্চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে। কোনো অনুষ্ঠানে শব্দের মাত্রা নিয়ে আপত্তি থাকলে শব্দ কমানো, অনুষ্ঠান শুরুর সময় পরিবর্তন করা কিংবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করার মতো বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজা যেতে পারে। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, কোনো সমস্যার সমাধান করতে হবে; সংস্কৃতির পথ বন্ধ করে দেওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।
তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, আইন মেনে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছামতো বাধা দিতে পারবে না—এ বিষয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট থাকা দরকার। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইন ভঙ্গ করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু আইনসম্মত আয়োজনকে অযৌক্তিক চাপের মুখে বন্ধ করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়।
শেখ সাদী খানের বক্তব্যে রাজনীতি ও সংস্কৃতির সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে এসেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সংস্কৃতি ও মানুষের স্বার্থের জায়গায় একটি ন্যূনতম ঐকমত্য প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। সাংস্কৃতিক পরিসর দুর্বল হলে তার প্রভাব কেবল শিল্পী ও বিনোদনজগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সমাজের মানসিক পরিবেশ, সৃজনশীলতা এবং তরুণ প্রজন্মের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
প্রবীণ সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনও কনসার্ট বাতিলের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর প্রধান উদ্বেগ শিল্পী ও আয়োজকদের আর্থিক ক্ষতি নিয়ে। তাঁর মতে, কারও কোনো গান বা অনুষ্ঠান ভালো নাও লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে কেউ অনুষ্ঠান না দেখা বা না শোনার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগত অপছন্দ বা আপত্তির কারণে অন্যদের জন্য একটি বৈধ আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়।
সাবিনা ইয়াসমীনের মতে, কোনো সরকারি সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের কোনো আয়োজন নিয়ে আপত্তি থাকলে তা অনুষ্ঠান শুরুর আগেই আয়োজকদের জানানো প্রয়োজন। এতে আয়োজকেরা প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করতে পারেন। প্রয়োজনে সময়, শব্দের মাত্রা, অনুষ্ঠানস্থল বা অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় আনা সম্ভব। কিন্তু সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর অনুষ্ঠান বাতিল হলে আয়োজকদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত থাকে।
তিনি একই সঙ্গে মনে করেন, সাংস্কৃতিক আয়োজনের ক্ষেত্রেও নিয়ম ও শৃঙ্খলা মানা জরুরি। শব্দদূষণ, নিরাপত্তা, অনুমতি, সময়সীমা বা অন্য কোনো বিধি নিয়ে সমস্যা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে সমস্যার সমাধান হিসেবে সরাসরি গানবাজনা বা কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হওয়া উচিত নয়।
সংগীতশিল্পী ও ব্যান্ড তারকা হামিন আহমেদ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে দেখছেন। তাঁর মতে, কোনো অনুষ্ঠান বাতিলের সময় শেষ মুহূর্তে প্রশাসনিক বা নিবন্ধনসংক্রান্ত কারণ সামনে এলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এসব বিষয় আগে যাচাই করা হলো না কেন। তাঁর দৃষ্টিতে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অতীতে বাধা, হয়রানি বা অপমানের অভিযোগের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যায়।
তবে শিল্পীদের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তাঁরা নিয়মহীন বা দায়িত্বজ্ঞানহীন অনুষ্ঠান আয়োজনের পক্ষে নন। আয়োজকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যেন ব্যাহত না হয়, শব্দের মাত্রা যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে, অনুষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয় এবং দর্শক ও শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়—এসব বিষয় শুরু থেকেই পরিকল্পনায় রাখতে হবে।
বিশেষ করে শব্দদূষণ, যানজট, নিরাপত্তা, অনুষ্ঠানস্থলের অনুমতি এবং সময়সীমা নিয়ে আপত্তি থাকলে আগেই সমাধানের সুযোগ থাকে। প্রশাসন যদি স্পষ্ট নিয়ম ও শর্ত আগে থেকে জানিয়ে দেয়, আয়োজকেরাও সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারবেন। এতে অনুষ্ঠানস্থলে শেষ মুহূর্তের বিরোধ, উত্তেজনা কিংবা বাতিলের মতো পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
এখানে প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যেমন সাংস্কৃতিক আয়োজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের অভিযোগকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো এলাকায় অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের অসুবিধা, যান চলাচল, শব্দের মাত্রা বা নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি থাকলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আগাম যোগাযোগ ও স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে অনেক বিরোধই অনুষ্ঠান বাতিলের পর্যায়ে যাওয়ার আগেই মিটিয়ে ফেলা সম্ভব।
কনসার্টকে শুধু বিনোদনের একটি আয়োজন হিসেবে দেখলেও এর অর্থনৈতিক দিকটি উপেক্ষা করা যায় না। একটি অনুষ্ঠান ঘিরে শিল্পী ও আয়োজকদের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবহন, খাবার, মঞ্চ নির্মাণ, শব্দ ও আলোকসজ্জা, নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়। দর্শকের উপস্থিতিও অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশের ব্যবসায় কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শেষ মুহূর্তে কোনো আয়োজন বাতিল হলে তার প্রভাব একটি নির্দিষ্ট মঞ্চের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।
শিল্পীদের বক্তব্যে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার—তাঁরা আপত্তিহীন পরিবেশ চান না; তাঁরা চান আপত্তি ও মতপার্থক্য মোকাবিলার একটি নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা। কোনো আয়োজন সত্যিই আইনবহির্ভূত হলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, সামাজিক চাপ কিংবা কোনো গোষ্ঠীর আপত্তি যেন আইনগত প্রক্রিয়ার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিক দুটি কনসার্ট বাতিলের ঘটনা তাই কেবল দুটি অনুষ্ঠান না হওয়ার বিষয় হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট শিল্পীরা। তাঁদের কাছে এটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ আয়োজনের ওপর আস্থার প্রশ্নও। শিল্পী ও আয়োজকেরা চাইছেন, কোনো সমস্যা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আগে আলোচনায় বসুক। প্রয়োজন হলে আয়োজনের ধরন বা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হোক। কিন্তু বাধা ও অনিশ্চয়তা যেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক অংশ হয়ে না যায়।
দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহু বছরের। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে শিল্পী, আয়োজক, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। মতের ভিন্নতা থাকবে, পছন্দের পার্থক্যও থাকবে। কিন্তু সেই পার্থক্যকে আলোচনার মাধ্যমে সামলানোর সক্ষমতাই একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশের পরিচয়।
শিল্পীদের প্রত্যাশা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা, আগাম প্রশাসনিক সমন্বয় এবং কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। কোনো আয়োজন নিয়ে আপত্তি থাকলে তা শেষ মুহূর্তে নয়, পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখেই আয়োজকদের জানানো হবে। এতে যেমন স্থানীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে, তেমনি শিল্পী ও আয়োজকদের অযাচিত আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও কমবে।
গান, নাটক, সাহিত্য কিংবা অন্য কোনো শিল্পচর্চা সমাজের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার জায়গা তৈরি করে। সেই পরিসরকে নিরাপদ, নিয়মতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক রাখা জরুরি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই নতুন করে সামনে এনেছে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য