সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ই আগস্ট ২০২৬, ১১:১২ পিএম

বাংলা ব্যান্ডের কিংবদন্তি প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর অমলিন স্মৃতি রক্ষা এবং তাঁর কালজয়ী গানগুলোকে নতুন প্রজন্মের সামনে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘উত্তরাধিকার’ নামের একটি বিশেষ সংগীতায়োজন। সংগীতাঙ্গনের বর্তমান সময়ের প্রতিভাবান ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের গায়কীতে আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় ২০টি গান নতুন সংগীতায়োজনে উপহার দেওয়ার কথা ছিল এই অ্যালবামে। আয়োজক দলের পক্ষ থেকে শুরুতেই জানানো হয়েছিল, এই পুরো প্রকল্প থেকে অর্জিত সমস্ত অর্থ ব্যয় করা হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘আইয়ুব বাচ্চু মিউজিয়াম’ গড়ে তোলার কাজে। তবে একটি শুভ উদ্দেশ্য নিয়ে সংগীতায়োজনটি যাত্রা শুরু করলেও ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে গানগুলো আসার পর থেকেই চরম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১৬ আগস্ট আইয়ুব বাচ্চুর জন্মবার্ষিকীতে বিশেষভাবে আত্মপ্রকাশ করে ‘উত্তরাধিকার’ অ্যালবামটি। অ্যালবামের সূচনা হিসেবে গুণী শিল্পী বাপ্পা মজুমদারের কণ্ঠে ভেসে আসে বিখ্যাত গান ‘রুপালি গিটার’, যা শ্রোতারা দারুণ সমাদরে গ্রহণ করেন। এই অ্যালবামের মোট ৭টি গান ইতোমধ্যে শ্রোতাদের সামনে এসেছে। তবে বিতর্কের সূত্রপাত হয় যখন অ্যালবামের দ্বিতীয় গান হিসেবে সংগীত পরিচালক ও শিল্পী অদিত রহমানের কণ্ঠে ‘ঘুমন্ত শহরে’ প্রকাশ পায়। মূল গানের সুরের কাঠামো ও চেনা গায়কি বদলে নিজের মতো করে পরিবেশন করেছেন অদিত। আর এই নতুন ধরনকেই কালজয়ী সৃষ্টির অবমাননা বলে অভিহিত করছেন লক্ষ লক্ষ এলআরবি ও আইয়ুব বাচ্চু অনুরাগী।
ইউটিউবের কমেন্ট বক্স এবং সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এখন সাধারণ শ্রোতা ও অনুরাগীদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার ঝড় বইছে। তাঁদের প্রধান অভিযোগ, গানটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া দিতে গিয়ে মূল সৃষ্টির মূল আবেদন ও গভীর আবেগ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ইউটিউবে আকাশ আবির নামের এক শ্রোতা তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, “বাচ্চু ভাইকে এভাবে অপমান করা একদমই উচিত হয়নি, গানের আসল প্রাণটাই হাওয়া হয়ে গেছে।” অন্য এক শ্রোতা বায়জিদ সিয়াম তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে লিখেছেন, “পুরো গানটির বারোটা বাজিয়ে দেওয়া হয়েছে।” শ্রোতাদের একটি বড় অংশ মনে করেন, আইয়ুব বাচ্চুর মতো আইকনিক শিল্পীর সৃষ্টির পুনর্নির্মাণে আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া উচিত ছিল। অনতিবিলম্বে গানটি ইউটিউব চ্যানেলসহ সমস্ত প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি তুলেছেন ক্ষুব্ধ অনুরাগী সমাজ।
অন্যদিকে আইয়ুব বাচ্চুর জন্মবার্ষিকী ঘিরে আরও অনেক শিল্পী তাঁর গান কাভার করেছেন। তাঁদের মধ্যে তরুণ শিল্পী মোল্লা বাবুর গাওয়া ‘কষ্ট কাকে বলে’ গানটি শ্রোতাদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেছে ও প্রশংসিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের এই বিতর্ক নিয়ে মুখ খুলেছেন তিনি। মোল্লা বাবু জানান, তিনি সারাজীবন আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা বজায় রেখেই সংগীতচর্চা করে যেতে চান। ‘উত্তরাধিকার’ প্রজেক্টের ধারণাটি প্রশংসনীয় হলেও ‘ঘুমন্ত শহরে’ গানটির নতুন রূপায়ন তাঁকেও হতাশ করেছে। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, এটি কোনো নতুন বা মৌলিক গান হলে শ্রোতারা হয়তো সাদরে গ্রহণ করত, কিন্তু আইয়ুব বাচ্চুর কালজয়ী গানের সঙ্গে যে ইতিহাস ও গভীর আবেগ জড়িয়ে আছে, তা এই সংস্করণে পুরোপুরি গায়েব হয়ে গেছে।
অ্যালবামকে ঘিরে তৈরি হওয়া এমন সমালোচনার ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে এলআরবির দীর্ঘদিনের গিটারিস্ট এবং ‘আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশন’-এর সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মাসুদের ওপর। আইয়ুব বাচ্চুর সৃষ্টি সংরক্ষণ ও স্মৃতির সুরক্ষায় নিরলস কাজ করে যাওয়ার কারণে অনেক অনুরাগীই ভাবছিলেন এই বিতর্কের পেছনে হয়তো মাসুদেরও ভূমিকা রয়েছে। ভক্তদের এমন ভুল ধারণা ভাঙতে নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে একটি দীর্ঘ বার্তা প্রকাশ করেছেন তিনি।
বার্তায় আবদুল্লাহ আল মাসুদ পরিষ্কার করে জানান, ‘উত্তরাধিকার’ নামের এই অ্যালবাম প্রকল্পের সঙ্গে তাঁর বিন্দুমাত্র কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অ্যালবামের পরিকল্পনা, গান নির্বাচন বা সংগীত পরিবেশনার কোনো পর্যায়েই তিনি জড়িত ছিলেন না। ভক্তদের ক্ষোভের কারণ উপলব্ধি করতে পারেন জানিয়ে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন যে, নিজের গুরুর রেখে যাওয়া সৃষ্টির সম্মান ও মূল অনুভূতি ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি অতীতেও যুক্ত ছিলেন না এবং ভবিষ্যতেও কখনো থাকবেন না। কালজয়ী গানের ঐতিহ্য রক্ষা আর নতুন আয়োজনের আধুনিকতার এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত কোন পরিণতিতে পৌঁছায়, সেদিকেই এখন সবার নজর।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য