সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ই আগস্ট ২০২৬, ১:৪ পিএম

হিন্দি চলচ্চিত্রের গানের জগতে ইরশাদ কামিল এমন এক গীতিকার, যাঁর লেখা শুধু সিনেমার গল্পকে এগিয়ে নেয় না, শ্রোতার ব্যক্তিগত অনুভূতিকেও ছুঁয়ে যায়। প্রেম, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা, ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা, আত্মপরিচয় কিংবা শিকড়ের টান—তাঁর গানে এসব অনুভূতি বারবার ভিন্ন রূপে উঠে এসেছে। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি, জটিল ও গভীর আবেগকে সহজ, স্বাভাবিক এবং কাব্যিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারা।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে হিন্দি চলচ্চিত্রে কাজ করছেন ইরশাদ কামিল। তাঁর সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে পাঞ্জাবি শিকড়ের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। শৈশবের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক পরিবেশ, চারপাশের সংস্কৃতি এবং নিজের মাটির সঙ্গে সম্পর্ক তাঁর লেখার ভেতরে নানা ভাবে ফিরে এসেছে। ফলে তাঁর অনেক গান কেবল পর্দার চরিত্রের অনুভূতি হয়ে থাকে না; শ্রোতার নিজের জীবন, স্মৃতি ও সম্পর্কের সঙ্গেও অদ্ভুতভাবে মিশে যায়।
ইরশাদ কামিলের গানের ভাষা সাধারণত সহজবোধ্য। শব্দের ভারে আবেগকে আড়াল করার বদলে তিনি পরিচিত কথাবার্তার ভাষার কাছাকাছি থেকে কবিতার আবহ তৈরি করেন। তাঁর লেখায় কথ্য ভাষা ও কাব্যিকতার এমন একটি ভারসাম্য দেখা যায়, যা গানকে একই সঙ্গে স্বাভাবিক ও স্মরণীয় করে তোলে। একটি সাধারণ অনুভূতিকেও তিনি এমনভাবে সাজাতে পারেন, যাতে সেটি ব্যক্তিগত স্মৃতির মতো মনে হয়।
তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে পরিচালক ইমতিয়াজ আলীর সঙ্গে সহযোগিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের যৌথ কাজগুলোতে প্রেম ও সম্পর্কের পাশাপাশি ভ্রমণ, বিচ্ছিন্নতা, নিজের পরিচয় খোঁজা এবং নিজের কাছে ফিরে আসার মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এই ধরনের গল্প ইরশাদ কামিলের গীতিকবিতার স্বভাবের সঙ্গেও গভীরভাবে মিলে যায়। ফলে পর্দার দৃশ্যের সঙ্গে গান যুক্ত হওয়ার পর আবেগটি আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে।
সংগীত পরিচালক এ আর রহমানের সঙ্গেও ইরশাদ কামিলের দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিশীল সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের যৌথ কাজের ক্ষেত্রে শব্দ ও সুরের সমন্বয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কখনও কোমল প্রেম, কখনও বিচ্ছেদের কষ্ট, আবার কখনও নিজের অস্তিত্ব ও জীবনের অর্থ খোঁজার অনুভূতি—বিভিন্ন আবেগ তাঁর কথায় সুরের সঙ্গে মিশে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
ইরশাদ কামিলের সাম্প্রতিক কাজের ক্ষেত্রেও শিকড় ও আত্মপরিচয়ের প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ। ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ গানটির ক্ষেত্রে কবীরের ভাবনা তাঁকে প্রভাবিত করেছে। কবীরের দর্শনে নিজের ভেতরে ফিরে তাকানো, বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা পেরিয়ে আত্মসন্ধান এবং জীবনের গভীর সত্যকে উপলব্ধি করার যে প্রবণতা রয়েছে, ইরশাদ কামিল সেই ভাবনাকে নিজের গীতিকবিতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে ‘ফিরে আসা’ এখানে শুধু কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় ফিরে যাওয়ার অর্থ বহন করে না; এর সঙ্গে নিজের ভেতরের পরিচয়ের কাছেও ফিরে যাওয়ার ধারণা যুক্ত হয়।
এই জায়গাতেই তাঁর গানে ‘ঘর’ শব্দটির অর্থ আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। ঘর তাঁর গানে কেবল একটি বাড়ি বা ভৌগোলিক স্থান নয়। এটি হতে পারে শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের মানুষ, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক, পরিচিত কোনো শহর কিংবা এমন একটি মানসিক আশ্রয়, যেখানে মানুষ নিজেকে সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ মনে করে।
তাই ইরশাদ কামিলের কোনো গানে ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা শুনলে শ্রোতা নিজের জীবনের সঙ্গে তার যোগ খুঁজে নিতে পারেন। কারও মনে পড়ে শৈশবের বাড়ি। কারও মনে ভেসে ওঠে দূরে থাকা কোনো প্রিয় মানুষ। আবার কারও কাছে সেই গান নিজের হারিয়ে যাওয়া সময় কিংবা শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। গানের গল্প হয়তো নির্দিষ্ট একটি চরিত্রকে ঘিরে, কিন্তু অনুভূতিটি হয়ে ওঠে সবার।
ইরশাদ কামিলের লেখার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো আবেগকে সরাসরি চাপিয়ে না দেওয়া। তিনি অনেক সময় এমন শব্দ ও চিত্রকল্প ব্যবহার করেন, যা শ্রোতাকে নিজের মতো করে অর্থ খুঁজে নেওয়ার সুযোগ দেয়। একটি গান তাই একই সঙ্গে চলচ্চিত্রের দৃশ্যের অংশ এবং শ্রোতার ব্যক্তিগত স্মৃতির বাহন হয়ে উঠতে পারে।
এই কারণেই তাঁর গানের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু জনপ্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনো গান সিনেমার দৃশ্য থেকে আলাদা হয়েও শ্রোতার মনে জায়গা করে নেয়। সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও সেই গান শুনলে পুরোনো কোনো সম্পর্ক, জায়গা কিংবা জীবনের একটি নির্দিষ্ট সময় মনে পড়ে যেতে পারে। গান তখন বিনোদনের মাধ্যমের বাইরে গিয়ে স্মৃতির দরজা খুলে দেয়।
পাঞ্জাবি সাংস্কৃতিক শিকড়, কবিতার প্রতি অনুরাগ, সহজ ভাষায় গভীর অনুভূতি প্রকাশের ক্ষমতা এবং দীর্ঘ চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতা—এই কয়েকটি বিষয় ইরশাদ কামিলের স্বতন্ত্র গীতিকণ্ঠ গড়ে তুলেছে। তাঁর গান কখনও প্রেমের কথা বলে, কখনও বিচ্ছেদের; কখনও আবার মানুষের নিজের কাছে ফিরে যাওয়ার গল্প শোনায়। কিন্তু এসবের ভেতর দিয়ে বারবার ফিরে আসে পরিচিত কোনো আশ্রয়ের অনুভূতি।
সমকালীন হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত গীতিকার হিসেবে ইরশাদ কামিলের দীর্ঘ পথচলা দেখিয়েছে, জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গানেও সাহিত্যিক অনুভূতি ও ব্যক্তিগত স্মৃতির জায়গা তৈরি করা সম্ভব। তাঁর গানের শক্তি সেখানেই—তিনি পর্দার চরিত্রের অনুভূতিকে এমন ভাষা দেন, যা শ্রোতার নিজের অনুভূতি বলেও মনে হতে পারে।
আর সেই কারণেই ইরশাদ কামিলের গান শুনলে অনেকের মনে হয়, এটি যেন দূরের কোনো গল্প নয়। বরং গানটি নিজের ঘর, নিজের মানুষ, নিজের শিকড় এবং ফেলে আসা কোনো সময়ের কথাই বলছে। তাঁর গানের ‘ঘর’ তাই একটি ঠিকানা নয়; এটি এমন এক অনুভূতি, যেখানে মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের কাছেই ফিরে আসে।
মন্তব্য