সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই মার্চ ২০২৩, ২:৫৭ পিএম

ভারতীয় সংগীতে ‘শ্রুতি’ (Shruti/Śruti) হলো সুরের এমন ক্ষুদ্রতম অন্তর বা ধাপ, যা মানুষের কান পৃথকভাবে অনুধাবন করতে পারে এবং কোনও গায়ক বা বাদ্যযন্ত্রী উৎপাদন করতে সক্ষম। অন্য কথায়, এক স্বর থেকে আরেক স্বরে ওঠানামার পথে যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধাপের অনুভূতি হয়, সেই সূক্ষ্ম পরিবর্তনকেই বলা হয় শ্রুতি।
প্রাচীন ভারতীয় সংগীতশাস্ত্র—নাট্যশাস্ত্র, দত্তিলম, বৃহদেশী, সঙ্গীত রত্নাকর—এসব গ্রন্থে শ্রুতি ধারণাটি বিস্তৃতভাবে আলোচিত। ছান্দোগ্য উপনিষদে এমনকি স্বরের পরিসরকে ২২ ভাগে বিভক্ত করার উল্লেখ রয়েছে। এ থেকেই ভারতীয় সংগীতে শ্রুতির সংখ্যা ২২ বলে স্বীকৃত হয়।

Table of Contents
অনেকেই মনে করেন শ্রুতি আর স্বর একই জিনিস—কিন্তু সংগীততত্ত্বে এরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা।
নাট্যশাস্ত্র স্পষ্টভাবে জানায়—এক অক্টেভে ২২টি শ্রুতি এবং ৭টি স্বর। অর্থাৎ স্বর হলো প্রাথমিক ধাপ, কিন্তু শ্রুতি সেই ধাপগুলোর সূক্ষ্ম বিভাজন।
শ্রুতির ধারণা শুধু তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তব সঙ্গীতে শ্রুতি রাগের চরিত্র নির্মাণেও মুখ্য ভূমিকা রাখে।
বিখ্যাত কিছু উদাহরণ—
এসব ব্যবহারের ফলে রাগের বিশেষ আবহ সৃষ্টি হয়, যা শ্রোতার মনে আলাদা রস সঞ্চার করে।
ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে শ্রুতি শব্দটি বিভিন্ন প্রেক্ষিতে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রাম পদ্ধতি (Grama System)-এ ভিন্ন অর্থে শ্রুতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ভারত মুনির ব্যাখ্যায়—দুই সুরের মধ্যে এমন ক্ষুদ্র ব্যবধান, যা শ্রুতি দিয়ে আলাদা করে শোনা যায়, তাকেই শ্রুতি বলা হয়েছে।
ভারতীয় সংগীতে আজও শ্রুতি নিয়ে অনুসন্ধান, মতান্তর এবং গবেষণা চলমান। বিশেষত কর্ণাটক সংগীতে, শ্রুতি শব্দটির বহুমাত্রিক অর্থ পাওয়া যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে—
এ কারণে বহু সঙ্গীততাত্ত্বিক মনে করেন—শ্রুতির সংখ্যা স্থির নয়; তা ২২-এর চেয়ে কমও হতে পারে, আবার কিছু ব্যাখ্যায় বেশি হিসেবেও দেখা যায়।
একটি প্রভাবশালী গ্রন্থে শ্রুতির তিন ভিন্ন প্রকৃতি উল্লেখ করা হয়েছে—
শতকরা হিসেবে এদের আনুমানিক মান—২২%, ৭০%, ৯০%। অর্থাৎ সব শ্রুতি সমান নয়; প্রতিটির অনুপাত আলাদা।
এই অংশটি সাধারণ পাঠকের জন্য কিছুটা জটিল হতে পারে; তাই সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
বীণা-শাস্ত্রজ্ঞেরা বলেন—২২টি শ্রুতির মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট স্থানে স্বরের ভিত্তি পাওয়া যায়, যেমন:
একটি স্বর চিনতে মানুষের কর্ণের লাগে ২০–৪৫ মিলিসেকেন্ড।
এ কারণেই মীণ্ড, গামক, অতি-দ্রুত অলঙ্কার—এসব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট শ্রুতি নির্ণয় করা কঠিন।
প্রাচীন শাস্ত্রে বলা হয়—শ্রুতিকে ‘শ্রব্য’ (যা শোনা যায়) বলা হয়েছে।
একটি তারে নির্দিষ্ট ২২টি বিন্দুতে সুরের অনুভূতি বদলে যায়।
পণ্ডিত মতঙ্গ রচিত বৃহদেশী-তে উল্লেখ আছে—
“যে বিন্দুতে শ্রোতার কানে সুর পরিবর্তনের অনুভূতি জন্মায়, সেই সুরই শ্রুতি।”
শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণে ২২টি শ্রুতির অনুপাত তিন ধরনের—
এসব অনুপাত রাগের সূক্ষ্মতা নির্ণয়ে অত্যন্ত জরুরি।
গামক—রাগসংগীতের প্রাণ।
যে কোনও গামকের মধ্যে দুটি ধাপ থাকে—
এই সংমিশ্রণই রাগকে তার বৈশিষ্ট্যমূলক অভিব্যক্তি দেয়।
৭২ মেলকার্তা রাগ তত্ত্বে ১২টি স্বরের নানা বিন্যাসে স্কেল তৈরি হয়। প্রতিটি রাগে শ্রুতি-প্রয়োগ ভিন্ন হতে পারে, তবে লক্ষ্য হলো রাগের সুরসৌকর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বর ও শ্রুতির সম্পর্ক স্থাপন করা। সাধারণত ব্যবহৃত স্বরগুলোর অনুপাত রাখা হয় 100:125:133.33:150:166.66 ইত্যাদি অনুপাতে।
আধুনিক গবেষণা বলছে—
ফ্লুট, সারণী, সেতার, কণ্ঠ—সব মাধ্যমেই এই বিচিত্রতা পাওয়া গেছে।
এর অর্থ—শ্রুতি হলো সাংগীতিক অভিব্যক্তির একটি জীবন্ত, পরিবর্তনশীল, শিল্পীমনস্ক ধারণা; যান্ত্রিকভাবে নির্ধারিত সংখ্যা নয়।
মন্তব্য