ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসরে কখনো কি এমন গান শুনেছেন, যার কথার কোনো মানে নেই, অথচ সেই সুর আর ছন্দের দোলা আপনার পায়ের আঙুল থেকে মাথার চুল পর্যন্ত এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে যাচ্ছে? ঠিক ধরেছেন, আজ আমরা কথা বলব উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অন্যতম চমৎকার আর গতিশীল এক শৈলী—‘তারানা’ (বা তেলেনা) নিয়ে।
সহজ কথায়, তারানা হলো অর্থহীন কতগুলো ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টির ওপর ভর করে তৈরি হওয়া এমন এক বিশেষ গানের ধারা, যা নিমেষেই শ্রোতার মন ভালো করে দেয়।

Table of Contents
তারানা
ইতিহাসের পাতা থেকে: আমির খসরুর সেই অমর সৃষ্টি
এই জাদুকরী গীতশৈলীর ইতিহাস ঘাঁটতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, সুলতানি আমলে। দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজির রাজসভার প্রধান রত্ন, প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও সুফি সাধক হজরত আমির খসরু এই ব্যতিক্রমী ঘরানার গান প্রবর্তন করেন। প্রচলিত আছে, ফারসি ও ভারতীয় সঙ্গীতের মেলবন্ধন ঘটাতে গিয়েই তিনি এই অনন্য শৈলীটি আবিষ্কার করেছিলেন, যা আজ শত শত বছর পরেও সমান উজ্জ্বল।
খেয়ালের খালাতো ভাই, কিন্তু চরিত্রে একদম আলাদা!
তারানা গান গাওয়ার প্রক্রিয়াটা কিন্তু অনেকখানি ‘খেয়াল’ গানের মতোই, তবে এদের মধ্যে একটা মস্ত বড় তফাত আছে—আর তা হলো ‘ভাষা’। খেয়াল গানে যেখানে সাহিত্য, কবিতা বা ভাবসমৃদ্ধ কথার গুরুত্ব অনেক বেশি; তারানার দুনিয়ায় সেখানে শব্দের কোনো আভিধানিক অর্থই থাকে না!
তারানার শরীরে জড়িয়ে থাকে—দেরেনা, নাদেরে, তানা, দানি, দেরদের, ইয়ালালোম, তা দেরে, দেরতুম, ওদিয়ানা, দ্রিম, ইয়ালালি—এরকম অদ্ভুত সব ধ্বনিসমষ্টি। মাঝে মাঝে অবশ্য এর মধ্যে কিছু ফারসি শব্দের ছোঁয়াও পাওয়া যায়। তবে তারানাকে আরও বেশি জমকালো ও বৈচিত্র্যময় করে তুলতে এর ভেতর তবলা বা পাখোয়াজের ‘বোল’ (যেমন: ধা কেটে তাক, তেরেকেটে তাক) অত্যন্ত নান্দনিকভাবে জুড়ে দেওয়া হয়। তারানার মূল অবয়ব বা কাঠামো তৈরি হয় কেবল দুটি ভাগে—স্থায়ী আর অন্তর।
তালের গতি আর জিহ্বার ব্যায়াম
তারানা গানে মূলত রাগ আর তালের কারিগরিটাই আসল। এটি সাধারণত গাওয়া হয় প্রচণ্ড দ্রুতলয়ে। আর এই দ্রুতগতির লয়কারী আর ছোট ছোট তানের নিখুঁত কাজ যখন ঝড়ের বেগে শ্রোতাদের কানে আছড়ে পড়ে, তখন পুরো আসর মুহূর্তে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সাধারণত ত্রিতাল, একতাল বা ঝাঁপতালের মতো চেনা তালগুলোতেই তারানা বেশি বাঁধা হয়।
সঙ্গীতের গুণীজনদের কাছে তারানার গুরুত্ব কিন্তু আরও এক জায়গায়। দ্রুত গতিতে এই অর্থহীন শব্দগুলো স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতে হয় বলে, গায়কির জড়তা বা জিহ্বার তোতলামি কাটাতে তারানা রেওয়াজ করাকে এক দারুণ ব্যায়াম মনে করা হয়।
ওস্তাদ তানরস খাঁ, ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাঁ, ওস্তাদ নথু খাঁ এবং ওস্তাদ নিসার হোসেন খাঁর মতো কিংবদন্তি সঙ্গীতজ্ঞরা ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তারানা রচয়িতা ও শিল্পী। আজও বড় বড় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পীরা আসরে দীর্ঘক্ষণ গম্ভীর মেজাজে খেয়াল গাওয়ার পর, মনকে একটু হালকা ও আনন্দিত করতে ঠুংরি বা ভজনের বদলে তারানা পরিবেশন করতে ভালোবাসেন।
একটি ঐতিহ্যবাহী তারানার নমুনা
আসুন, এই চমৎকার গায়কির স্বাদ নিতে একটি বিখ্যাত তারানার বাণী দেখে নেওয়া যাক:
স্থায়ী:
নাদেরে দেরে তা দেরে না দেরে না
নাদের দের তা দেরে না
ইয়ালালোম ইয়ালালোম
ইয়ালালি ইয়ালালে।
দের না তানা নানা নানা নানা
তাদের না ইয়ালালোম ॥
অন্তরা:
নাদের দেরতুম দেরদের তানা দেরে না
তানা তানা দেরে না
দের দের দের তা দারে দানি
তা দের না তানা দেরে না
দিম দের না দিম তানা
দের দের দের তা দারে দানি
ধা কেটে তাক ধুম কেটে তাক ধিৎ তা ক্রান
ধাতি ধা কেড়ে নাক তেরেকেটে তাক ক্রান
কেড়ে নাক তেরেকেটে ধাতি ধা ক্রান
তা ধা ইয়ালালোম ইয়ালালোম ॥
এক নজরে এই তারানার রাগ পরিচিতি (রাগের জ্যামিতি):
যারা রাগসঙ্গীতের ব্যাকরণ ভালোবাসেন, ওপরের এই চমৎকার তারানাটির টেকনিক্যাল ডিটেইলস তাদের জন্য:
- ঠাট: বিলাবল
- রাগ: বিহাগ
- বাদীস্বর (গানের রাজা স্বর): গান্ধার ($গ$)
- সমবাদীস্বর (গানের মন্ত্রী স্বর): নিষাদ ($ন$)
- অঙ্গ: পূর্বাঙ্গ প্রধান
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে ৫টি ও অবরোহণে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)
- গায়ন সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টা)
- আরোহী: ন\ স\ গ\ ম\ প\ ন\ র্স
- অবরোহী: স\ ন\ ধ\ প\ ক্ষগ\ মগ\ রস
আরও দেখুন:
