শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল আঙিনায় কিছু রাগ আছে, যা কানে আসামাত্রই মনটা এক নিমেষে চনমনে হয়ে ওঠে; ঠিক যেন কাঠফাটা রোদের মাঝে হঠাৎ ছুটে আসা এক পশলা ঠান্ডা হাওয়া। এমনই এক অদ্ভুত প্রাণবন্ত ও চমত্কার রাগ হলো ‘রাগ বৃন্দাবনী সারং’। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে এটি ‘কাফি’ ঠাটের অন্তর্গত একটি প্রধান রাগ। এই রাগের নামকরণের মাঝেই জড়িয়ে আছে বৃন্দাবনের নাম, যা এর ভেতরের রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ও ভক্তিভাবকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এর চলনটি বেশ চমৎকার—আরোহণে গান্ধার (গা) ও ধৈবত (ধা) বর্জিত থাকে, আর অবরোহণে কেবল গান্ধার বর্জিত হয়। নাম ও রূপের কারণে ‘রাগ গৌড়সারং’-এর সাথে এর এক মধুর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এর আসল ম্যাজিক লুকিয়ে আছে এর ‘নিষাদ’ (নি) স্বরের ব্যবহারে; এই রাগে শুদ্ধ এবং কোমল—দুই ধরনের নিষাদই অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ব্যবহৃত হয়।
রাগ বৃন্দাবনী সারং । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
রাগের কারিগরি ও সুরের অনন্য বুণন:
বৃন্দাবনী সারং রাগের আরোহণে পাঁচটি স্বর এবং অবরোহণে ছয়টি স্বর ব্যবহৃত হওয়ার কারণে এর অবয়বটি এক চমৎকার ঔড়ব-ষাড়ব রূপ ধারণ করে।
- ঠাট: কাফি
- জাতি: ঔড়ব-ষাড়ব (আরোহণে ৫ স্বর, অবরোহণে ৬ স্বর)
- আরোহণ: স র ম প ন র্স (এখানে ‘ন’ হলো শুদ্ধ নিষাদ)
- অবরোহণ: র্স ণ ধ প ম র স (এখানে ‘ণ’ হলো কোমল নিষাদ)
- বাদীস্বর (রাগের প্রধান রাজা): ঋষভ (র)
- সমবাদী স্বর (রাগের উজির বা মন্ত্রী): পঞ্চম (প)
- অঙ্গ: পূর্বাঙ্গ প্রধান
- পকড় (রাগের আসল চাবিকাঠি): ণ্ র্স র, র ম র, র ম প, ম র স ণ্ র, স।
এই রাগের প্রধান রাজা বা বাদীস্বর হলো ‘ঋষভ’ (রে)। গায়ক যখন ওস্তাদি মায়ায় রেখাব বা ঋষভ স্বরের ওপর দাঁড়িয়ে সুরের বিস্তার করেন, ঠিক তখনই দুই নিষাদের আলো-ছায়ার খেলায় রাগটি তার নিজস্ব আভিজাত্য প্রকাশ করে।
সময়ের মায়াজাল ও শ্রোতার মনস্তত্ত্ব:
রাগ বৃন্দাবনী সারং-এর আসল আবেদন ও তার জাদুকরী প্রভাব টের পাওয়া যায় এর পরিবেশনের সময়ে। এই রাগের জন্য ওস্তাদরা বেছে নেন দিবা দ্বিতীয় প্রহর বা মধ্যদুপুরের সময়টিকে।
যখন চারপাশের প্রকৃতি মধ্যদুপুরের কড়া রোদে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, জাগতিক ব্যস্ততা যখন তুঙ্গে—ঠিক তখনই তানপুরার জাদুকরী ঝংকারে প্রাণ পায় বৃন্দাবনী সারং। এর বাদীস্বর ‘ঋষভ’ আর দুই নিষাদের চমৎকার দোলা শ্রোতার মনে এক অদ্ভুত সতেজতা, আনন্দ এবং এক চঞ্চল ব্যাকুলতার জন্ম দেয়। ক্লান্ত দুপুরে এই রাগের প্রতিটি তান ও মীড় শ্রোতার অবচেতন মনকে এক লহমায় সমস্ত ক্লান্তি থেকে মুক্ত করে এক স্নিগ্ধ শান্তিতে ভরিয়ে দেয়। এটি কেবল কিছু স্বরের নিখুঁত বিন্যাস নয়, বরং ভরা দুপুরে মানুষের তপ্ত হৃদয়কে সুরের চাদরে জুড়িয়ে দেওয়ার এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক ম্যাজিক।

তথ্যসূত্র:
রাগ বিন্যাস (প্রথম কলি) — শ্রীশচীন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য্য। এস, চন্দ্র অ্যান্ড কোং (শারদীয়া সপ্তমী, সেপ্টেম্বর ১৯৭৬)।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।















