সুরের কিংবদন্তি ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিন আজ

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের জীবন্ত কিংবদন্তি ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁকে ঘিরে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শুভেচ্ছার আবহ তৈরি হয়েছে। প্রায় সাত দশকের দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি তাঁর সুমধুর কণ্ঠ, অনবদ্য পরিবেশনা এবং শিল্পসত্তার অনন্য প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংগীতের ধারা ও শ্রোতাদের রুচিতে নানা পরিবর্তন এলেও তাঁর গানের আবেদন আজও অমলিন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর গান শুনে আবেগাপ্লুত হয়েছে এবং এখনো নতুন শ্রোতাদের কাছে তাঁর কণ্ঠ সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।

১৯৪১ সালের এই দিনে ভারতের কুচবিহারে জন্মগ্রহণ করেন ফেরদৌসী রহমান। শৈশব থেকেই তিনি সংগীতের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। বাংলা লোকসংগীতের কিংবদন্তি আব্বাস উদ্দীন আহমদের স্নেহ ও দিকনির্দেশনায় তাঁর সংগীতজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। অল্প বয়সেই শিশুশিল্পী হিসেবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিলেও, ১৯৫৫ সালে রেডিওতে বড়দের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনের মধ্য দিয়েই তাঁর আনুষ্ঠানিক সংগীতজীবনের সূচনা ঘটে।

সংগীতজীবনের শুরু থেকেই তিনি ধারাবাহিকভাবে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৫৭ সালে এইচএমভি থেকে তাঁর প্রথম গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়, যা তাঁকে আরও বৃহত্তর শ্রোতামহলের কাছে পরিচিত করে তোলে। এরপর ১৯৫৯ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘এই দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে প্রথমবারের মতো প্লেব্যাক করেন। ১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রেও তাঁর কণ্ঠ দর্শক-শ্রোতাদের প্রশংসা কুড়ায়। চলচ্চিত্র, আধুনিক গান, দেশাত্মবোধক সংগীত, নজরুলসংগীত ও লোকসংগীত—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছেন।

বাংলাদেশের সম্প্রচার ইতিহাসেও তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর নবপ্রতিষ্ঠিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান টেলিভিশন, বর্তমান বাংলাদেশ টেলিভিশনের আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার শুরু হয়েছিল তাঁর গান দিয়েই। এই ঘটনা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, দেশের সম্প্রচার ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

শুধু একজন সফল শিল্পী হিসেবেই নয়, সংগীতশিক্ষক হিসেবেও ফেরদৌসী রহমানের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর পরিচালিত শিশুদের সংগীতবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’ প্রায় ৪৪ বছর ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে। এটি দেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও জনপ্রিয় শিশু সংগীত শিক্ষার অনুষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অসংখ্য শিশু সংগীতচর্চার প্রতি আগ্রহী হয়েছে এবং পরবর্তীকালে অনেকেই প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশ-বিদেশে বহু সম্মাননা অর্জন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে লাহোর চলচ্চিত্র সাংবাদিক পুরস্কার (১৯৬৩), প্রেসিডেন্টস প্রাইড অব পারফরম্যান্স (১৯৬৫), একুশে পদক (১৯৭৭) এবং বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদক (১৯৯৫)। এসব পুরস্কার তাঁর দীর্ঘ সাধনা, নিষ্ঠা এবং বাংলা সংগীতের প্রতি অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি বহন করে।

ফেরদৌসী রহমান কেবল একজন শিল্পীর নাম নয়; তিনি বাংলাদেশের সংগীত-ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসের জীবন্ত অধ্যায়। তাঁর কণ্ঠে পরিবেশিত অসংখ্য গান আজও শ্রোতাদের আবেগ, স্মৃতি ও ভালোবাসার অংশ হয়ে আছে। নতুন শিল্পীদের জন্য তাঁর জীবন ও কর্ম এক অনুপ্রেরণার উৎস।

জন্মদিনে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও শান্তিময় জীবন কামনা করছেন তাঁর অগণিত ভক্ত, শুভানুধ্যায়ী ও সহশিল্পীরা। বাংলা গানের আকাশে তাঁর সুরের মাধুর্য আরও বহু বছর অনুরণিত হোক—এটাই সবার প্রত্যাশা।