নজরুলের কালজয়ী গানে শুরু কোক স্টুডিও বাংলার নতুন আসর

দেশের জনপ্রিয় সংগীত আয়োজন ‘কোক স্টুডিও বাংলা’-এর চতুর্থ মৌসুমের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়েছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে এক বিশেষ সাংস্কৃতিক স্মারক ও শ্রদ্ধা নিবেদনের অংশ হিসেবে এই নতুন আসরের যাত্রা শুরু হলো কবির অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বর্ষার গান ‘রুম ঝুম’-এর মাধ্যমে। নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী, গত ১৮ মে ২০২৬ তারিখে এক ঘোষণার পর আজ সন্ধ্যা সাতটায় কোক স্টুডিও বাংলার অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে এই উদ্বোধনী গানটি বিশ্বব্যাপী শ্রোতাদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

‘রুম ঝুম’ গানের উৎস ও আন্তর্জাতিক সংযোগ

কোক স্টুডিও বাংলার চতুর্থ মৌসুমের প্রথম পরিবেশনা ‘রুম ঝুম’ গানটির একটি সুদীর্ঘ এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক ইতিহাস রয়েছে। এই গানের মূল সুরটি মূলত একটি প্রাচীন অটোমান-তুর্কি লোকসংগীত ‘উস্কুদারা গিদের ইকেন’ থেকে নেওয়া হয়েছিল। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেই অনন্য সুরটি গ্রহণ করে সেটিকে চমৎকার এক বাংলা বর্ষার কবিতায় রূপান্তর করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে সংগীতে রূপ নেয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালিরা এই কালজয়ী গানটি গেয়ে আসলেও এর এমন দীর্ঘ ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ভ্রমণের কথা অনেকেরই অজানা ছিল। কোক স্টুডিও বাংলা তাদের চতুর্থ সিজনে এসে সেই হারিয়ে যাওয়া বহুমাত্রিক সংগীত ঐতিহ্যকে একই মঞ্চে আবার একত্রিত করে এই সুরের যাত্রাকে এক অনন্য পূর্ণতা দান করেছে।

নতুন ধারার এই আন্তর্জাতিক পরিবেশনাটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের দুই জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মাহতিম শাকিব ও নুসরাত জাহান। তাঁদের সঙ্গে এই গানে যৌথভাবে পারফর্ম ও সহযোগিতা করেছেন দুই তুর্কি সংগীতশিল্পী আলিফ হান্দে সেভগেল এবং মোস্তফা ইপেক। এই যুগান্তকারী গানের মাধ্যমেই কোক স্টুডিও বাংলার মূল মঞ্চে মাহতিম শাকিবের আনুষ্ঠানিক অভিষেক ঘটল এবং নুসরাত জাহানও এক নতুন কণ্ঠ হিসেবে নিজের সংগীতযাত্রা শুরু করলেন।

নিচে কোক স্টুডিও বাংলার চতুর্থ মৌসুমের উদ্বোধনী গানের মূল পরিচিতি ও তথ্য ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

গানের শিরোনামমূল সুরের উৎসমূল রচয়িতা ও রূপান্তরকঅংশগ্রহণকারী শিল্পী ও সংশ্লিষ্ট দেশমুক্তির মাধ্যম ও সময়
রুম ঝুমউস্কুদারা গিদের ইকেন (অটোমান-তুর্কি লোকসংগীত)জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামমাহতিম শাকিব ও নুসরাত জাহান (বাংলাদেশ), আলিফ হান্দে সেভগেল ও মোস্তফা ইপেক (তুরস্ক)ইউটিউব চ্যানেল, সন্ধ্যা ৭:০০ টা

শিল্পীদের অনুভূতি ও নতুন মৌসুমের রূপরেখা

কোক স্টুডিও বাংলার পক্ষ থেকে পাঠানো একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, এই চতুর্থ মৌসুমে সর্বমোট আটটি গান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই আটটি গানের প্রতিটিই ভিন্ন ভিন্ন মানবিক আবেগ, ঐতিহ্য এবং সুনির্দিষ্ট সংগীত ধারার ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত নিপুণভাবে তৈরি করা হয়েছে।

কোক স্টুডিও বাংলার মঞ্চে নিজের প্রথম কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে শিল্পী মাহতিম শাকিব বলেন যে, ‘রুম ঝুম’ গানের অংশ হতে পারা তাঁর সংগীত ক্যারিয়ারের জন্য সত্যিই এক বিশেষ ও অনন্য অভিজ্ঞতা। এই গানটি একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করে। কোক স্টুডিও বাংলা এমন একটি বৃহৎ প্ল্যাটফর্ম বা মঞ্চ তৈরি করেছে, যেখানে কালজয়ী পুরোনো সংগীতকে বর্তমান প্রজন্মের শ্রোতাদের সঙ্গে সংযুক্ত করার মতো করে আধুনিক ঢঙে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং একই সঙ্গে এর মূল শিকড় ও প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি যথাযথ সম্মান ও নিবেদন শতভাগ বজায় রাখা হয়েছে।

সহ-শিল্পী নুসরাত জাহান নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন যে, এই গানটি তাঁর কাছে অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং ভীষণ অর্থবহ। তিনি আরও জানান যে, গানটির নতুন সংগীত প্রযোজনা করেছেন শুভেন্দু, যিনি তাঁর ছোটবেলা থেকেই তাঁর এবং তাঁর সহোদর ভাই সাইফের প্রধান মেন্টর বা শিক্ষাগুরু ছিলেন। নিজের সেই প্রিয় শিক্ষাগুরুর সঙ্গে এমন একটি বড় মঞ্চে কাজ করতে পারা তাঁর কাছে একটি স্বপ্ন পূরণের মতো ঘটনা। কোক স্টুডিও বাংলার মাধ্যমে নিজের জীবনের মূল সংগীতযাত্রা ‘রুম ঝুম’-এর মতো একটি ঐতিহাসিক গানের মাধ্যমে শুরু করতে পেরে এই পুরো অভিজ্ঞতাটি তাঁর কাছে আরও বেশি বিশেষ ও স্মরণীয় হয়ে উঠেছে।

কোক স্টুডিও বাংলার লক্ষ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য

বিগত ২০২২ সালে বাংলাদেশে কোক স্টুডিও বাংলা প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল। সূচনালগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি বাংলা লোকজ ও আধুনিক সংগীতের সঙ্গে বহির্বিশ্বের গভীর সংযোগ ও মেলবন্ধন খুঁজে বের করার মাধ্যমে শ্রোতামহলে নিজেদের এক অনন্য স্বকীয়তা ও আলাদা পরিচিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

কোক স্টুডিও বাংলার এই বিশেষ উদ্যোগ এবং নতুন মৌসুমের উদ্বোধনী গান সম্পর্কে কোকা-কোলা বাংলাদেশ লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মঈন উল্লাহ চৌধুরী বলেন যে, শতবর্ষ প্রাচীন একটি তুর্কি লোকজ সুর যখন বাংলা কবিতায় অত্যন্ত সার্থকভাবে জায়গা করে নেয়, তখন এটি মূলত বৈশ্বিক সংস্কৃতির এক অবাধ অগ্রযাত্রাকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। কোক স্টুডিও বাংলা তার চতুর্থ আসরের প্রথম পরিবেশনার মাধ্যমে সেই চিরন্তন সত্য এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনকেই বিশ্বমঞ্চে বিশেষ সম্মান জানাল।