হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল সাগরে এমন কিছু রাগ রয়েছে, যা গভীর শাস্ত্রীয় নিয়মে বাঁধা থাকলেও তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে মাটির সুবাস আর লোকজীবনের চেনা সুর। এমনই এক অনন্য ও মধুর রাগের নাম ‘রাগ মাণ্ড’ (বা রাগ মান্দ)। রাজস্থানের মরুভূমির তপ্ত হাওয়া আর লোকগাথার লোকসুরের (Folk melody) ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই রাগটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আঙিনায় এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।
Table of Contents
রাগ মাণ্ড বা রাগ মান্দ । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনেক রাগই বেশ জটিল ও গম্ভীর প্রকৃতির হলেও ‘রাগ মাণ্ড’ তার ব্যতিক্রম। এটি মূলত রাজস্থানের বিখ্যাত ‘মাণ্ড’ লোকগীতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রূপ লাভ করেছে। এই রাগের ভেতরে যে চপলতা, মাধুর্য আর লোকসুরের দোলা রয়েছে, তা যেকোনো সাধারণ শ্রোতার মনকেও এক লহমায় ছুঁয়ে যায়। হালকা ধ্রুপদী সঙ্গীত, ঠুমরি, গজল কিংবা ভজনের জন্য রাগ মাণ্ড অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পছন্দ।
রাগ ‘আশা’-র সাথে তুলনা ও স্বাতন্ত্র্য
অনেকে রাগ মাণ্ডের সুরের সাথে রাগ ‘আশা’-র মিল খুঁজে পান। প্রকৃতপক্ষে, এই দুই রাগের স্বর গঠন বা ব্যবহৃত স্বরগুলো একই হলেও এদের গায়কী এবং চলনের (সুর বিস্তারের ধরণ) মধ্যে বেশ স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আর এই চলনের ভিন্নতাই রাগ মাণ্ডকে এক স্বতন্ত্র সৌন্দর্য দান করেছে।
রাগ মাণ্ড-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিয়মানুযায়ী রাগ মাণ্ডের মূল কাঠামো ও পরিচিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
- ঠাটের পরিচয় (Thaat): রাগটি উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে বিলাবল ঠাটের অন্তর্গত।
- জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো ঔড়ব-সম্পূর্ণ। অর্থাৎ, আরোহণের সময় দুটি স্বর (গান্ধার ও নিষাদ) বর্জিত থাকে এবং ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অবরোহণের সময় ৭টি স্বরই (সম্পূর্ণ রূপ) ব্যবহৃত হয়।
- বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো মধ্যম (মা)।
- সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো ষড়্জ (সা)।
- অঙ্গ (Anga): এটি একটি পূর্বাঙ্গ প্রধান রাগ।
- পরিবেশনের সময় (Time): রাগ মাণ্ড গাওয়ার বা বাজানোর আদর্শ সময় হলো রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর। রাতের নিস্তব্ধতায় এই রাগের লোকজ মাধুর্য যেন আরও বেশি ডানা মেলে।
আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়
রাগটির সুরের গতিপ্রকৃতি ও চলন বোঝার জন্য এর প্রধান স্বরলিপি নিচে দেওয়া হলো:
আরোহণ: স র ম প ধ র্স
অবরোহণ: র্স ন ধ p ম গ র স
পকড় (রাগের মূল রূপ): মগর, ম, পধ, মগর, সন্ধ্, স

তথ্যসূত্র
এই রাগের তাত্বিক ও ক্রিয়াত্মক পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণের জন্য প্রখ্যাত সঙ্গীত গবেষক শক্তিপদ ভট্টাচার্য রচিত এবং ১৫ এপ্রিল ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত ‘উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত’ গ্রন্থটির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
পরিশেষ
রাগ মাণ্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল উৎস কিন্তু আসলে এদেশের মাটির গানই। রাজস্থানি লোকসুর থেকে এসে বিলাবল ঠাটের এই রাগটি যেভাবে ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকে নিজের জায়গা করে নিয়েছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। যেকোনো শান্ত রাতে রাগ মাণ্ডের সেতারের আলাপ বা ঠুমরি শুনলে মনটা এক নিমেষেই হারিয়ে যায় দূর কোনো দিগন্তে।
রাগ-সঙ্গীত নিয়ে তৈরি এই সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্রটি আপনার কেমন লাগল, তা আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
