সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জানুয়ারি ২০২৩, ৮:৩৩ পিএম

বাংলা সঙ্গীতে রাগ–রাগিণীর নিজস্ব ব্যাখ্যা, প্রয়োগ ও রূপায়ণ বহু ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। তবে বিশ শতকের প্রথমার্ধে একমাত্র কাজী নজরুল ইসলাম এমনভাবে শাস্ত্রীয় রাগের ভেতর নতুন রস, নতুন ছায়া ও নতুন পরিচয় এনে দিয়েছিলেন, যা আজও এক বিশিষ্ট উদাহরণ।
তাঁর সৃষ্ট “রাগ যোগিনী” সেই ব্যতিক্রমধর্মী ও মৌলিক উদ্ভাবনগুলির অন্যতম।
Table of Contents

সময়কাল: ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ।
স্থান: কলকাতা বেতার কেন্দ্র (All India Radio, Calcutta)।
উদ্দেশ্য: নাটিকা “উদাসী ভৈরব”-এর জন্য সঙ্গীত সংযোজন।
‘রাগ যোগিনী’ প্রথম ব্যবহৃত হয় নজরুল সুরারোপিত এই নাটিকার গানে। উক্ত নাটিকার রচয়িতা ছিলেন জগৎ ঘটক, যিনি পরবর্তীতে সাক্ষাৎকারে স্মরণ করেন:
“সুরেশদা কবিকে ভৈরব রাগের প্রচলিত রূপ এড়িয়ে নতুন ধাঁচের সুর তৈরি করতে অনুরোধ করেছিলেন। কবি সেই নিয়ে এমন মগ্ন হয়ে পড়লেন যে, ঘুমের মধ্যেও রাগ–রাগিণীর স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। আর সেই সময়েই তিনি উদ্ভাবন করলেন নতুন কিছু রাগ — অরুণ ভৈরব, উদাসী ভৈরব, রুদ্র ভৈরব, ও যোগিনী।”
(তথ্যসূত্র: জগৎ ঘটকের সাক্ষাৎকার, সুরসপ্তক: নজরুল জন্মশতবার্ষিকী সংখ্যা, ১৯৯৮, কলকাতা বেতার আর্কাইভস)
এই নাটিকা “উদাসী ভৈরব” ১৯৩৯ সালের ১২ নভেম্বর সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছিল — সে সময়ের মুদ্রিত রেডিও প্রোগ্রাম সিডিউলের আর্কাইভেও এই সম্প্রচারের তথ্য মেলে।
নাটিকার ছয়টি গানই রচনা করেন ও সুরারোপ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। এই উপলক্ষে তিনি নানা রাগমিশ্রণকে নতুন আকারে উপস্থাপন করেন — যার অন্যতম উজ্জ্বল সৃষ্টি “রাগ যোগিনী।”
‘যোগিনী’ রাগটি শুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংজ্ঞায় নজরুলের এক সংকর রাগ (Hybrid Rāga)। অর্থাৎ এটি কয়েকটি ভিন্ন ঠাটের (মূল রাগ–পরিবার) মিলনবিন্দুতে তৈরি।
মূল স্বরগঠনে দেখা যায়—
এই তিনটি ঠাটের স্বর–বিন্যাসের শিল্পসম্মত সংমিশ্রণে নজরুল গড়ে তোলেন অভিনব “যোগিনী”।
আরোহণ: স ঋ জ্ঞ হ্ম দ প, ম প ণ দ প র্স
অবরোহণ: র্স ন দ প, প হ্ম জ্ঞ, ম, ম গ ঋ স
রাগটির ঝোঁক ধ্যানমগ্ন, করুণ ও প্রশান্ত লয়ে। এর রস মূলত “করুণ” — একমুহূর্তে স্নিগ্ধ, পরক্ষণে বেদনাময়।
এই রাগে টোড়ীর কোমল স্বর ও ভৈরবের গাম্ভীর্যের সংমিশ্রণ তৈরি করেছে এক অনন্য শ্রাব্য দৃশ্য।
এর পূর্বাঙ্গে—স ঋ জ্ঞ হ্ম দ প—টোড়ীর স্পর্শ,
আর উত্তরাঙ্গে—ম প ণ দ প র্স—আশাবরীর গুণাবলি স্পষ্ট।
এর অবরোহী পথ যখন শুরু হয়, তখন ভৈরবের স্বভাবসিদ্ধ ‘র্স ন দ প’ তথা মর্যাদাভরা ধ্বনি ধীরে ধীরে রাগকে ভক্তিমূলক স্বরে স্থাপন করে।
সুতরাং ‘যোগিনী’ রাগকে বলা যায়—
টোড়ীর কোমলতা, আশাবরীর আশ্বাস, ভৈরবের প্রগাঢ়তা—এই ত্রিবিধ রসে সিক্ত এক সমন্বিত সুরপাত্র।
“যোগিনী” শব্দটি সংস্কৃত “যোগিনি” থেকে, অর্থাৎ সাধিকা, তপস্বিনী, যিনি জ্ঞানের যোগসূত্রে আত্মাকে অনুধাবন করেন।
কাজী নজরুল ইসলাম এই রাগে যেন সেই আধ্যাত্মিক নারীসত্তারই প্রতীক খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর রচিত ‘যোগিনী’ রাগের গানে তাই দেব–মানব চেতনার মিলন ফুটে ওঠে।
এই রাগে নজরুলের একটি প্রমাণিত গান পাওয়া যায়—
“শান্ত হও, শিব, বিরহবিহ্বল”
এটি এক খেয়ালনির্ভর আধা–ধ্রুপদ সংগীত, যা উদাসী ভৈরব নাটিকায় পরিবেশিত হয়েছিলেন।
গবেষক আলী নওরোজ ও সোহরাব হোসেনের ‘নজরুল সঙ্গীত রাগ বিশ্লেষণ সংকলন’ (বাংলা একাডেমি, ২০০৫) অনুযায়ী, গানটির রাগরূপ ‘যোগিনী’ হিসেবেই স্বীকৃত।
গানের চরিত্রে প্রকাশ পায় শিব–পার্বতীর পৌরাণিক রসকে আধুনিক মানবিকতায় রূপান্তরিত করার নজরুলীয় শৈলী—যা সেই সময়ের হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বিরল।
রাগ যোগিনী কেবল নজরুলীয় সৃষ্টির নিদর্শন নয়, এটি তাঁর সঙ্গীতচিন্তার সাহসিকতার প্রতীক।
এখানে তিনি শাস্ত্রবদ্ধ রাগরূপের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এক নতুন রাগধর্মী ভাবরূপ নির্মাণ করেছেন—যা একাধারে শাস্ত্রীয় ও আধুনিক।
পরবর্তীকালে তাঁর এসব রাগ–প্রয়োগ বাংলাদেশ বেতারের নজরুলসংগীত বিভাগ, রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রশিক্ষক, এবং শিল্পীদের কাছে নিয়মিত শিক্ষণ ও গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১. জগৎ ঘটক। “নজরুলের সুরসৃষ্টি ও আমার স্মৃতি।” সুরসপ্তক, কলকাতা বেতার আর্কাইভস, ১৯৯৮।
২. সোহরাব হোসেন ও আলী নওরোজ। নজরুল সঙ্গীত: রাগ বিশ্লেষণ সংকলন। বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৫।
৩. শক্তিপদ ভট্টাচার্য। উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত, ১৯৮৭।
৪. “উদাসী ভৈরব সম্প্রচারের নোটিশ।” দৈনিক আজাদ, ১১ নভেম্বর ১৯৩৯, কলকাতা সংস্করণ।
মন্তব্য