বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা আধুনিক গান ও চলচ্চিত্রের রূপালী পর্দাকে যাঁরা রোমান্টিকতা, বিরহ আর আবেগের উষ্ণতায় জড়িয়ে রেখেছিলেন, তাঁদের নাম নিলে সবার আগে মনে পড়ে এক পর্দার আড়ালের জাদুকরের কথা। তিনি আর কেউ নন—বাঙালির মননের ধ্রুবতারা, অনন্য কবি ও গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার।
মান্না দের কণ্ঠে তাঁর লেখা ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানটি শোনেনি, এমন বাঙালি মেলা ভার। ২০০৪ সালে বিবিসির এক আন্তর্জাতিক জরিপে গানটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় মর্যাদাপূর্ণ স্থান করে নেয়। অথচ, এত এত কালজয়ী গানের এই স্রষ্টাকে আমরা কতটুকুই বা মনে রেখেছি? সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় সব আলো কেড়ে নেন সামনের জন—কণ্ঠশিল্পী বা পর্দার নায়ক-নায়িকা। পেছনে থেকে যিনি পুরো আবেগের কাঠামোটা দাঁড় করালেন, সেই গীতিকার বা সুরকার থেকে যান ব্রাত্যের তালিকায়। তাই গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে অনায়াসেই বলা যায় বাংলা সঙ্গীত ইতিহাসের এক মহান ‘আনসাং হিরো’ (Unsung Hero)।

Table of Contents
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার: বাংলা সঙ্গীতের ‘আনসাং হিরো’ ও এক অবিনাশী কবি-মনন
পাবনার ‘বাচ্চু’ থেকে কলকাতার এম.এ:
১৯২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। পরিবারে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘বাচ্চু’। তাঁর পিতা গিরিজাপ্রসন্ন মজুমদার ছিলেন সে সময়ের এক অত্যন্ত বিখ্যাত ও নামী উদ্ভিদবিদ।
গৌরীপ্রসন্নকে আমরা কেবল ‘প্রিয় গীতিকার’ হিসেবেই চিনেছি, কিন্তু তিনি আসলে জন্মেছিলেন এক বড় কবি হওয়ার মনন নিয়ে। তাঁর পড়াশোনা ও সাহিত্যজ্ঞান ছিল প্রখর। শিক্ষাজীবনেই তিনি মহাকবি কালিদাসের বিখ্যাত ‘মেঘদূতম’ মহাকাব্যটি সংস্কৃতে পড়ে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করে ফেলেছিলেন! পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ও বাংলা—উভয় সাহিত্যে স্নাতকোত্তর (M.A.) ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। এই প্রথাগত শিক্ষাই তাঁর গীতি-রচনায় শব্দের নিখুঁত ও চমৎকার চয়ন এনে দিয়েছিল। তবে জীবনের মোড় বদলে একসময় এই কবি নিজেকে সঁপে দেন সুর ও সঙ্গীতের মহাসমুদ্রে।
শচীন কর্তা থেকে নচিকেতা ঘোষ: সুরের কিংবদন্তিদের সঙ্গে মেলবন্ধন
সঙ্গীত সাধনার একদম শুরুর দিকেই গৌরীপ্রসন্ন পেয়েছিলেন শচীন দেববর্মণের (শচীন কর্তা) মতো মানুষের সান্নিধ্য。 তাঁদের ভেতরের কেমিস্ট্রি এতটাই জমজমাট ছিল যে, দুজনের যৌথ সৃষ্টিতে জন্ম নেয় ‘মেঘ কালো আঁধার কালো’ কিংবা ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’—এর মতো কালজয়ী গান। শচীন দেববর্মণ আদর করে তাঁকে বলতেন ‘কলকাতার মজরুহ্ সুলতানপুরী’।
শুধু শচীন কর্তাই নন; হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মান্না দে, রাহুল দেববর্মণ, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়—কে গাননি তাঁর লেখা গান! আর গীতিকার গৌরীপ্রসন্নের নাম উঠলে যার নাম অনায়াসে চলে আসে, তিনি হলেন সুরকার নচিকেতা ঘোষ। নচিকেতা ঘোষের সুর করা প্রায় সত্তর ভাগ গানের পেছনেই ছিল গৌরীপ্রসন্নের জাদুকরী লেখনী। আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ এবং নচিকেতা ঘোষের সুরে তৈরি “এই মোম জোৎস্নায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি” গানটি শুনলে বোঝা যায়, একজন গীতিকার কীভাবে সুরের আবহে আস্ত একটা দুর্দান্ত কবিতা বুনে দিতে পারেন!
মুক্তিযুদ্ধে এক অনন্য শব্দসৈনিক ও ‘একটি মুজিবরের থেকে’
১৯৬৫ সালের দিকে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার পাবনার আদি ভিটেমাটি ছেড়ে কলকাতায় পাড়ি জমান। দেশ ছাড়লেও নিজের মাতৃভূমির প্রতি টান তাঁর বিন্দুমাত্র কমেনি। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন বাংলাদেশে উত্তাল স্বাধীনতার হাওয়া বইছে, তখন কলকাতার আকাশবাণীর এক কর্মকর্তার রেকর্ড প্লেয়ারে তিনি শুনেছিলেন ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক অনলবর্ষী ভাষণ।
বঙ্গবন্ধুর সেই ডাক শুনে তরুণ গৌরীপ্রসন্নের রক্ত গরম হয়ে ওঠে। তিনি সেই আড্ডাতেই একটি সিগারেটের প্যাকেটের উল্টো দিকের সাদা কাগজে লিখে ফেললেন বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এক গান—
“শোনো, একটি মুজিবরের থেকে / লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি / আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি… / বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ।”
অংশুমান রায়ের সুর ও কণ্ঠে গানটি যুদ্ধের দিনগুলোতে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের এবং মুক্তিযোদ্ধাদের শিরায় শিরায় স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানেও এই গানটি বাজানো হয়েছিল এবং এটি ‘মিলিয়ন মুজিবর সিঙ্গিং’ নামে ইংরেজিতে অনূদিতও হয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর খোদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আন্তরিক আমন্ত্রণে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে পা রাখেন। বাংলাদেশ বেতারের জন্য তখন তিনি লিখেছিলেন আরেকটি কালজয়ী গান—“মাগো, ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে”। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এই গানটি সে সময় ওপার এবং এপার বাংলা—দুই বাংলাতেই তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
গীতিকার নাকি কবি? এক চিরন্তন অভিমান
২০১৬ সালে মার্কিন গায়ক ও বাংলাদেশের পরম বন্ধু বব ডিলান যখন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান, তখন গান ও কবিতার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা আবার নতুন করে জমে ওঠে। বব ডিলান নিজে মনে করতেন, “আমি নিজেকে প্রথমে একজন কবি এবং পরে মিউজিশিয়ান মনে করি”। আমাদের গৌরীপ্রসন্নের চিন্তাধারাও ছিল ঠিক এমন।
১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে, দীর্ঘ ১০ বছর ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির সাথে লড়াই করেছেন তিনি। রোগশয্যায় কাটানো দিনগুলোতে তাঁর মনে জমেছিল এক বুক অভিমান ও ক্ষোভ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন:
“কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে গীতিকারদের স্থান দেওয়া হয় না। এ বড় ক্ষোভের কথা। অজয় ভট্টাচার্য, শৈলেন রায়, মোহিনী চৌধুরী প্রমুখ গীতিকারদের কবি প্রতিভা সম্বন্ধে কারও কোনও সন্দেহ থাকার কথা নয়। তবু কবি সম্মেলনে কোন গীতিকারকে ডাকা হয় না। কবিতায় সুর দিলেই গান হয় না। গানের ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা।”
তিনি আরও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, তা-ও কিন্তু আসলে একটি গানের বইয়ের (‘গীতাঞ্জলি’) জন্যই!
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কিছু অবিস্মরণীয় কালজয়ী সৃষ্টির তালিকা:
- অলির কথা শুনে বকুল হাসে
- আমার গানের স্বরলিপি
- আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা
- আমি যামিনী তুমি শশী হে
- এই পথ যদি না শেষ হয়
- এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন
- এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে
- এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায়, এ কী বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু
- এমন দিন আসতে পারে
- ও নদীরে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে
- ও মালিক সারাজীবন কাঁদালে
- কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই
- কী আশায় বাঁধি খেলাঘর
- কেন দূরে থাকো শুধু আড়াল রাখো কে তুমি কে তুমি আমায় ডাকো
- গানে মোর ইন্দ্রধনু
- তুমি না হয় রহিতে কাছে
- তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা
- নীর ছোট আকাশ তো বড়
- পথের ক্লান্তি ভুলে
- প্রেম একবার এসেছিল নীরবে
- বাঁশি শুনে আর কাজ নাই সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি
- মাগো, ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে
- শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কন্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে ওঠে রণি… বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ

বিশ শতকের মধ্যভাগে বাংলা সঙ্গীতের সোনালী যুগে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার যে মৌলিকত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তাতে রবীন্দ্র-নজরুল ও ডি.এল রায়ের ঠিক পরপারের বন্ধনীতেই তাঁর স্থান হওয়া উচিত。 ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট কলকাতার এক হাসপাতালে এই ধ্রুবতারা চিরতরে নিভে যায়। কিন্তু তিনি চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টিগুলো আজও প্রতিটি বাঙালিকে প্রেমে পড়তে শেখায়, বিরহে কাঁদতে শেখায় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার সাহস জোগায়। তিনি ‘আনসাং হিরো’ হতে পারেন, কিন্তু বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
