বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল শিল্পীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়ের স্রোত পেরিয়ে তারা নিজেরাই এক একটি যুগ, সংস্কৃতি এবং মানবসভ্যতার এক অদ্ভুত বিস্ময় হয়ে ওঠেন। তেমনই এক অনন্য ইতিহাসের নাম মাইকেল জ্যাকসন। কেবল কণ্ঠশিল্পী কিংবা সুরকার নন, নৃত্য, মঞ্চের আলোকময় উপস্থিতি এবং মিউজিক ভিডিওর চেনা ব্যাকরণ পাল্টে দেওয়া এই মানুষটি বিশ্ববাসীর কাছে হয়ে উঠেছিলেন পপ সংস্কৃতির চূড়ান্ত প্রতীক। আজ ২৯ আগস্ট, বিশ্বসংগীতের এই অবিসংবাদিত কিংবদন্তির জন্মবার্ষিকী। পৃথিবীতে তাঁর শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও তাঁর শিল্পের অমলিন আলোয় আজও আলোকিত হয়ে আছে কোটি ভক্তের হৃদয়।
১৯৫৮ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গ্যারি শহরে জন্ম নেওয়া মাইকেল জ্যাকসনের শৈশব কেটেছিল সুর আর সাধনায়। পরিবারের ভাইদের নিয়ে গড়া ‘জ্যাকসন ফাইভ’ দলের মধ্য দিয়ে খুব অল্প বয়সেই সংগীতের মূলধারায় প্রবেশ করেন তিনি। অসাধারণ কণ্ঠের জাদু আর সহজাত নৃত্যপ্রতিভা দিয়ে সেই ছোটবেলা থেকেই শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের প্রতিভার একক দীপ্তিতে তিনি এমন এক চূড়ায় পৌঁছান, যেখানে তাকে কেবল একজন গায়ক হিসেবে বিচার করার সুযোগ ছিল না। তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ‘কিং অব পপ’।
১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অফ দ্য ওয়াল’ অ্যালবাম তার একক ক্যারিয়ারের দারুণ এক সূচনা এনে দেয়। তবে আসল বিপ্লব ঘটে ১৯৮২ সালে, যখন প্রকাশ পায় সর্বকালের সেরা বিক্রিত অ্যালবামগুলোর একটি—‘থ্রিলার’। বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব রেকর্ড গড়ে এই অ্যালবামটি টানা ৩৭ সপ্তাহ মার্কিন তালিকার শীর্ষে অবস্থান করেছিল এবং এক রাতেই আটটি গ্র্যামি পুরস্কার জিতে নেওয়ার অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়েছিল। এই অ্যালবামের প্রায় প্রতিটি গানই বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘বিলি জিন’, ‘বিট ইট’, ‘হিউম্যান নেচার’ কিংবা নামী শিরোনামের গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। শুধু তাই নয়, ১৪ মিনিটের ‘থ্রিলার’ মিউজিক ভিডিওটি কেবল বিনোদন ছিল না, সেটি ছিল দৃশ্যকাব্য ও চলচ্চিত্রের ভাষার এক অপূর্ব সমন্বয়, যা চিরতরে পাল্টে দিয়েছিল মিউজিক ভিডিও তৈরির ইতিহাস।
মঞ্চে মাইকেল জ্যাকসনের উপস্থিতি মানেই ছিল যেন বিদ্যুতের ঝলক। তার শরীরী ভাষা, গান আর ছন্দের সঙ্গে নিখুঁত সমন্বয় ঘটিয়ে তৈরি করা হয়েছিল ‘মুনওয়াক’ বা রাজপথের নাচের নতুন সব মুদ্রা। কৃষ্ণাঙ্গ একজন শিল্পী হিসেবে বর্ণবাদের কঠিন দেয়াল ভেঙে বিশ্বসংগীতের মুকুটহীন সম্রাট হওয়া ছিল তার জীবনের অন্যতম বড় সামাজিক অর্জন। নিজের সাফল্য দিয়ে তিনি পথ প্রশস্ত করেছিলেন পরবর্তী প্রজন্মের বহু কৃষ্ণাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ শিল্পীর জন্য। শিল্পচর্চার পাশাপাশি মানবকল্যাণমূলক কাজেও তার অবদান ছিল অনন্য। আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সহায়তায় গাওয়া ‘উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড’ গানটির নেপথ্য কারিগর হিসেবে তিনি বিশ্ববাসীর মনে গভীর রেখাপাত করেছিলেন।
অবশ্য বর্ণাঢ্য এই জীবনের সমান্তরালে কম বাধা আসেনি। খ্যাতির চূড়ায় ওঠার পর নানা বিতর্ক, ব্যক্তিগত সংকট এবং বিশ্বমাধ্যমের অবিরত চাপ তাঁকে বহুবার স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। ২০০৯ সালের ২৫ জুন মাত্র ৫০ বছর বয়সে এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চিরবিদায় নেন পপসম্রাট। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো গ্রহ। কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করতে পারেননি যে মানুষটির কণ্ঠের জাদুতে পৃথিবী কেঁপে উঠত, তিনি আর নেই।
তবে সময়ের পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে শিল্প কখনো মরে না। মানুষ বিদায় নিলে তার সৃষ্টি বেঁচে থাকে। আজও পৃথিবীর কোনো না কোনো কোণে কেউ না কেউ তার গান শুনে নাচে মেতে ওঠেন, আবার কেউ ‘হিল দ্য ওয়ার্ল্ড’ কিংবা ‘ম্যান ইন দ্য মিরর’ বাজিয়ে মানবতার বাণী খোঁজেন। তরুণ প্রজন্মের কাছে তার সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা চলছে, তার নাচের মুদ্রাগুলো এখনো নতুন শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জোগায়।
যতদিন পৃথিবীতে সুর থাকবে, মঞ্চের আলো জ্বলবে এবং মানুষ নতুন কিছু সৃষ্টির স্বপ্ন দেখবে, ততদিন কোনো না কোনোভাবে বেঁচে থাকবেন মাইকেল জ্যাকসন। চোখের আড়ালে চলে গেলেও অনুভবে, সুরে এবং সংস্কৃতির প্রতিটি কোণায় তিনি চিরকাল সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। শুভ জন্মদিন, পপসম্রাট। আপনার অবিনশ্বর শিল্পের কোনো মৃত্যু নেই।
মন্তব্য