হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে যে কয়েকটি রাগ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়, আবেগঘন এবং শ্রোতার মনে এক অলৌকিক শান্তি এনে দেয়, তার মধ্যে অন্যতম একটি শীর্ষস্থানীয় রাগ হলো ‘রাগ ভীমপলাশ্রী’। দুপুরের ক্লান্তি শেষে বিকেলের শান্ত আলোয় এই রাগের বিস্তার শ্রোতা ও শিল্পী উভয়কেই এক অন্য জগতে নিয়ে যায়।
Table of Contents
রাগ ভীমপলাশ্রী: বিকেলের আলোয় স্নিগ্ধতা ও আকুলতার এক অনন্য সুরকাব্য
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসরে রাগ ভীমপলাশ্রী তার অসম্ভব মিষ্টি চলন এবং গভীর আবেদনের জন্য অত্যন্ত সুপরিচিত। এই রাগটি মূলত দুটি প্রাচীন রাগ—‘ভীম’ এবং ‘পলাশ্রী’-এর এক অপূর্ব ও সুনিপুণ মিশ্রণে তৈরি হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে চর্চার ফলে এই দুটি রাগের মিশ্রণ এখন এতটাই একাত্ম হয়ে গেছে যে, একে একটি স্বতন্ত্র রাগ হিসেবেই গণ্য করা হয়।
নামের ভিন্নতা
এই রাগটি মূলত ‘ভীমপলাশ্রী’ নামেই সবচেয়ে বেশি পরিচিত হলেও, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং প্রাচীন কিছু গ্রন্থে একে কিছুটা ভিন্ন নামেও ডাকা হয়। যেমন:
- ভীমপলাসী (প্রধানত দক্ষিণ ভারতে বা কর্ণাটকী সঙ্গীতে এর সমপ্রকৃতির রাগকে ‘কর্ণাটক দেবগন্ধারী’ বলা হলেও উত্তর ভারতে অনেকে ভীমপলাসী নামে ডাকেন)
- ভীমপলশ্রী
ইতিহাস ও বিশেষত্ব
ভীমপলাশ্রী একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাগ। এর বিশেষত্ব লুকিয়ে আছে এর স্বর বিন্যাসের চাতুর্যে। এই রাগের আরোহণে মাত্র ৫টি স্বর ব্যবহৃত হয়, কিন্তু অবরোহণের সময় এটি সম্পূর্ণ রূপ ধারণ করে। বিকেলের অলস ও শান্ত পরিবেশে যখন এই রাগের ‘কোমল গান্ধার’ ও ‘কোমল নিষাদ’-এর ওপর আন্দোলন করা হয়, তখন চারপাশের বাতাসে এক ধরণের মিষ্টি আকুলতা ও আধ্যাত্মিক ভাব ছড়িয়ে পড়ে। এটি মূলত করুণ ও শান্ত রসের রাগ।
রাগের শাস্ত্র
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়ম ও ব্যাকরণ অনুযায়ী রাগ ভীমপলাশ্রীর মূল কাঠামোটি নিচে তুলে করা হলো:
- ঠাট: রাগটি উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে কাফি ঠাটের অন্তর্গত।
- জাতি: এই রাগের জাতি হলো ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে ৫টি এবং অবরোহণে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: স জ্ঞ ম প ণ র্স
- অবরোহ: র্স ণ ধ প ম জ্ঞ র স
- বাদী স্বর: এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো মধ্যম (ম)।
- সমবাদী স্বর: রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো ষড়্জ (স)।
- বর্জিত স্বর: এর আরোহণের সময় ঋষভ (র) এবং ধৈবত (ধ) স্বর দুটি সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে। তবে অবরোহণে ৭টি স্বরই লাগে।
- ব্যবহৃত স্বর: এই রাগে গান্ধার ও নিষাদ কোমল (জ্ঞ, ণ) এবং বাকি সব স্বর শুদ্ধ রূপেই ব্যবহৃত হয়।
- সময়: এই রাগ গাওয়ার বা বাজানোর আদর্শ সময় হলো দিবা চতুর্থ প্রহর (বিকেলের সময় বা সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্ত)।
- প্রকৃতি: এটি অত্যন্ত শান্ত, গম্ভীর এবং করুণ রসপ্রধান রাগ।
- চলন: এর চলন মূলত মন্দ্র ও মধ্য সপ্তকে বেশি ফুটে ওঠে এবং এর স্বরপ্রয়োগ অত্যন্ত বক্র ও মিষ্টি (যেমন: ণ্ স ম, ম জ্ঞ, ম প)।
সম্পর্কিত রাগসমূহ (Related Ragas)
ভীমপলাশ্রী রাগের স্বর বিন্যাসের সাথে মিল থাকা বা এর সমপ্রকৃতির কিছু রাগের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- রাগ বাগেশ্রী: এই রাগের সাথে ভীমপলাশ্রীর স্বরসাম্য রয়েছে, তবে বাগেশ্রী রাত্রিকালীন এবং এর বাদী স্বর মধ্যম হলেও চলন ভিন্ন।
- রাগ কাফি: এটি ভীমপলাশ্রীর জনক ঠাট, যার ফলে এর অবরোহণের স্বরগুলোর সাথে কাফি রাগের সরাসরি মিল পাওয়া যায়।
- রাগ ধানশ্রী: এই রাগের আরোহণ ও অবরোহণের সাথে ভীমপলাশ্রীর প্রচুর মিল রয়েছে, তবে ধানশ্রীতে পঞ্চমের ব্যবহার বেশি।
- রাগ পটদীপ: ভীমপলাশ্রী রাগের কোমল নিষাদের জায়গায় শুদ্ধ নিষাদ ব্যবহার করলে তা রাগ পটদীপে রূপ নেয়।
- রাগ প্রদীপকী: এই রাগের চলনেও ভীমপলাশ্রীর তীব্র ছায়া লক্ষ্য করা যায়।
রাগ ভীমপলাশ্রী কেবল ব্যাকরণের ফ্রেমে বাঁধা কোনো সুর নয়, এটি মানুষের মনের গভীর অনুভূতির এক জীবন্ত রূপ। বিকেলের শান্ত আলোয় যখন এই রাগের আলাপ বা কোনো চমৎকার বন্দিশ বেজে ওঠে, তখন তা শ্রোতার সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। ক্ল্যাসিক্যাল সঙ্গীতের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের আধুনিক বাংলা গান এবং চলচ্চিত্রের বহু জনপ্রিয় গানেও এই রাগের প্রভাব দারুণভাবে লক্ষ্য করা যায়। সুরের এই মিষ্টি ধারা শত শত বছর ধরে আমাদের সঙ্গীত ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে আসছে।

তথ্যসূত্র (Sources)
১. ‘সঙ্গীত পরিচিতি’ (উত্তরভাগ) – শ্রীনীলরতন বন্দ্যোপাধ্যায়।
২. ‘উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত’ – শক্তিপদ ভট্টাচার্য।
৩. ‘ক্রমিক পুস্তক মালিকা’ – পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
৪. ‘রাগ বিন্যাস’ – শ্রীশচীন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য্য।
