সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই ডিসেম্বর ২০১৯, ৩:৮ এএম

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে “ঠাট” হলো রাগের শ্রেণিবিন্যাসের মূল কাঠামো। এই কাঠামোর মধ্যে ভৈরবী ঠাট এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে—করুণতা, গভীরতা ও আবেগী আবেদন এ ঠাটের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ভোরের আলো থেকে সন্ধ্যার বিষণ্ণতা—মানবমনের বহু রঙ ভৈরবী ঠাটের সুরে ধরা পড়ে।
Table of Contents
“ঠাট” বলতে এমন একটি মৌলিক স্বরসমষ্টিকে বোঝায়, যেখান থেকে একাধিক রাগের উদ্ভব ঘটে। আধুনিক হিন্দুস্তানি সঙ্গীতে এই ঠাট-ধারণাকে পদ্ধতিগতভাবে মান্যতা দেন Vishnu Narayan Bhatkhande। তাঁর প্রদত্ত পদ্ধতিতে ১০টি মৌলিক ঠাটের ভিত্তিতে প্রায় সব রাগকে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়—ভৈরবী তাদের অন্যতম।
ভৈরবী ঠাটের কাঠামো সম্পূর্ণ কোমল স্বরসমৃদ্ধ; শুধু ষড়জ ও পঞ্চম বাদে সব স্বরই কোমল—
ভৈরবী ঠাটের প্রধান রস হলো করুণ (Karuna Rasa) এবং ভক্তি (Bhakti Rasa)।
এ ঠাটে সুরের দোলাচল হৃদয়কে স্পর্শ করে—
এই কারণেই ভৈরবী ঠাট কেবল সংগীত নয়, অনেক সময় মানুষের আত্মোপলব্ধির মাধ্যম হয়ে ওঠে।
ভৈরবী ঠাটের অধীনে অনেক জনপ্রিয় ও গভীরতর রাগ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি—
রাগ ভৈরবী
ভৈরবী ঠাটের নামকরণ এসেছে এই রাগের নাম থেকেই। এটি প্রাতঃকালীন রাগ হিসেবে পরিচিত হলেও আধুনিক কালে যেকোনো সময়ে পরিবেশিত হয়। করুণ ও সমাপ্তিমুখী পরিবেশনার জন্য একে কনসার্টের শেষ রাগ হিসেবে প্রায়ই বেছে নেওয়া হয়।
রাগ সিন্ধু ভৈরবী
লোকসুর, ঠুমরি ও গজলের সঙ্গে এর গভীর যোগাযোগ রয়েছে। এই রাগে কখনো কখনো শুদ্ধ স্বরও ব্যবহৃত হয়—যা একে আরও নমনীয় ও আবেগী করে তোলে।
রাগ বিলাসখানি টোড়ি
ভৈরবী ও তোড়ির সংমিশ্রণধর্মী ছায়া বহন করে। এর সুরে থাকে একধরনের অতল বেদনা ও গাম্ভীর্য।
রাগ মাংরু / রাগ পিলু-ভৈরবী ধারা
এই ধারা লোকগীতি ও আধুনিক চলচ্চিত্র সংগীতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
ভৈরবী ঠাটের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ব্যবহার দেখা যায় নজরুলসঙ্গীতে। Kazi Nazrul Islam বহু গান ভৈরবী রাগ ও ঠাটে রচনা করেন—যেখানে ধর্মীয় আবেগ, প্রেম, মাতৃভক্তি ও মানবতাবোধ একাকার হয়ে গেছে।
নজরুলগীতিতে ভৈরবীর ব্যবহার প্রমাণ করে—এই ঠাট কেবল সংগীততত্ত্ব নয়, এটি বাঙালি মননের অংশ।
শুধু ভারত নয়—বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কাতেও ভৈরবী ঠাটের প্রভাব বিস্তৃত। ক্লাসিক্যাল, আধা-ক্লাসিক্যাল, লোকগান, কাওয়ালি, ভজন, কীর্তন—সব ধারাতেই এর উপস্থিতি আছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার চলচ্চিত্র সংগীতে ভৈরবী ঠাট বহু অমর সুরের জন্ম দিয়েছে।
ভৈরবী ঠাট শুধুমাত্র সংগীতের একটি কাঠামো নয়—
এটি বেদনার ভাষা,
এটি আত্মার আর্তি,
এটি নিঃশব্দ প্রার্থনার সুর।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই ঠাট মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিশে গেছে—হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, আশা-হতাশা—সবকিছুর সঙ্গী হয়ে।

ভৈরবী ঠাট হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এমন এক ভুবন, যেখানে হৃদয় কথা বলে ভাষাহীন সুরে। এটি আমাদের শেখায়—কোমল স্বর কখনো দুর্বল নয়, বরং তা-ই গভীরতম অনুভূতির বাহক।
যতদিন মানব হৃদয়ে অনুভূতি থাকবে,
ততদিন ভৈরবী ঠাট বেঁচে থাকবে।
মন্তব্য