সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই আগস্ট ২০২৬, ৭:৫ পিএম

পুরোনো গানের সুর, কথা ও আবেগকে নতুন সংগীতায়োজন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে ফিরিয়ে আনার প্রবণতা বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে বহুদিনের। ক্যাসেট ও সিডির যুগে যে চর্চার শুরু হয়েছিল, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে তা এখন আরও ব্যাপক হয়েছে। ইউটিউব, ফেসবুক, বিভিন্ন সংগীতসেবা এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওর মাধ্যমে কয়েক দশক আগের গানও সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে নতুন শ্রোতার কাছে। এতে একদিকে পুরোনো শ্রোতাদের মনে জেগে উঠছে নস্টালজিয়া, অন্যদিকে তরুণদের সামনে খুলে যাচ্ছে বাংলা সংগীতের সমৃদ্ধ অতীতের দরজা।
তবে রিমেকের জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে বিতর্কও বাড়ছে। পুরোনো গান নতুন করে পরিবেশন কি হারিয়ে যেতে বসা সৃষ্টিকে সংরক্ষণের একটি কার্যকর পদ্ধতি, নাকি নতুন গান তৈরির ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতার ঘাটতির ইঙ্গিত? বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে এই প্রশ্ন এখন বেশ জোরালোভাবেই আলোচিত হচ্ছে।
রিমেকের প্রবণতা অবশ্য নতুন নয়। নব্বইয়ের দশকেও পুরোনো চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ও নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশ করা হতো। বিভিন্ন মিশ্র অ্যালবামে পরিচিত সুরের সঙ্গে পপধারা, সিন্থেসাইজার ও সমকালীন শব্দপ্রযুক্তির ব্যবহার ছিল বেশ পরিচিত। মূল গানের আবেগ অক্ষুণ্ন রেখে সেটিকে সমসাময়িক শ্রোতার রুচির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই ছিল এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
ডিজিটাল যুগে সেই চর্চা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ‘চুমকি চলেছে একা পথে’ তার একটি আলোচিত উদাহরণ। ‘দোস্ত দুশমন’ চলচ্চিত্রে খুরশীদ আলমের কণ্ঠে জনপ্রিয় গানটি পরে পান্থ কানাই নতুন সংগীতায়োজনে পরিবেশন করেন। চলতি বছর তিনি ‘আবার চুমকি’ নামে গানটির সিক্যুয়ালধর্মী উপস্থাপনাও করেন। ভিডিওতে ষাট ও সত্তরের দশকের চলচ্চিত্রের আবহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ছিল। ফলে শ্রোতারা শুধু পরিচিত গানই পাননি, পুরোনো সময়ের দৃশ্যভাষার সঙ্গেও নতুন করে পরিচিত হয়েছেন।
একইভাবে ইমরান মাহমুদুল বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গান নতুন সংগীতায়োজন ও কণ্ঠে প্রকাশ করেছেন। ‘তুমি আমার জীবন’, ‘হৃদয়ের আয়না’, ‘তুমি চাঁদের জোছনা নও’, ‘আমার মনের আকাশে আজ জ্বলে শুকতারা’, ‘অনেক সাধনার পরে’ এবং ‘পৃথিবীতে সুখ বলে যদি’—এ ধরনের গান তাঁর পরিবেশনায় নতুন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছেছে। বিশেষভাবে আলোচনায় আসে ‘অনুতপ্ত’ চলচ্চিত্রে কুমার শানুর গাওয়া ‘আমার মনের আকাশে আজ’ গানের নতুন সংস্করণ। ইমরান গানটি গাওয়ার পাশাপাশি সংগীতায়োজনও করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকে গানটি শুনে বড় হওয়ায় মূল কথা ও সুরের আবেগ অক্ষুণ্ন রেখে নিজের সংগীতভাবনায় সেটিকে সাজানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।
লোকসংগীতেও পুনঃপরিবেশন ও নতুন সংগীতায়োজনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০০৩ সালে প্রকাশিত হাবিব ওয়াহিদের ‘কৃষ্ণ’ অ্যালবাম এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। রিমিক্স ও ফিউশনধর্মী সংগীতকে মূলধারার শ্রোতাদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তুলতে অ্যালবামটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে’ গানের মূল রচয়িতা ও সুরকার ছিলেন সিলেটের মরমী গীতিকবি ও সুফি সাধক আরকুম শাহ। হাবিব ওয়াহিদ গানটির আধুনিক সংগীতায়োজন করেন এবং কণ্ঠ দেন কায়া। লোকঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক শব্দপ্রযুক্তির এই সমন্বয় পরবর্তী সময়ে অনেক শিল্পীর জন্য নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে লোকগানের নতুন পরিবেশনার ক্ষেত্র আরও বড় হয়েছে। সিলেট অঞ্চলের বিয়ের গান ‘আইলো রে নয়া দামান’ মুজা ও তোসিবার কণ্ঠে নতুনভাবে প্রকাশের পর ২০২১ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। গানটি ঘিরে তৈরি হয় অসংখ্য নাচ ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও। তবে এর মূল রচয়িতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। পুরোনো বেতার রেকর্ডেও শিল্পী ও রচয়িতার পরিচয় নিয়ে অস্পষ্টতা পাওয়া যায়। এই ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, লোকগান নতুনভাবে পরিবেশনের পাশাপাশি তার উৎস, ইতিহাস ও স্রষ্টার পরিচয় সংরক্ষণ করাও জরুরি।
চলচ্চিত্রের গানও রিমেকের বড় উৎস। ‘বুক চিন চিন করছে’ গানটি ‘শিল্পী’ নাটকের নতুন সংস্করণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে আবার পরিচিতি পায়। মূল গানটি ‘বাস্তব’ চলচ্চিত্রে এন্ড্রু কিশোর ও ডলি সায়ন্তনীর কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়েছিল। নতুন সংস্করণে কণ্ঠ দেন জাহেদ পারভেজ পাভেল এবং সংগীত পুনর্বিন্যাস করেন আভ্রাল সাহির। ডিজিটাল মাধ্যমে গানটির ভিডিও ব্যাপক দর্শক পাওয়ায় বোঝা যায়, পরিচিত গানের নতুন সংস্করণের প্রতি এখনো বড় শ্রোতাগোষ্ঠীর আগ্রহ রয়েছে।
রিমেকের উদ্দেশ্য অবশ্য সব সময় বাণিজ্যিক নয়। কখনো মূল শিল্পীরাই নিজেদের পুরোনো গান নতুন করে শ্রোতাদের সামনে আনছেন। কুমার বিশ্বজিৎ একসময় নিজের গাওয়া ৪৮টি পুরোনো গান নতুনভাবে প্রকাশের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ভালো অনেক গান প্রকাশের সময় প্রত্যাশিত সংখ্যক শ্রোতার কাছে পৌঁছাতে পারেনি। নতুন সংগীতায়োজন ও আধুনিক পরিবেশনার মাধ্যমে সেসব গান আবার শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখানে সংগীত সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো রেকর্ডিংয়ের শব্দমান সময়ের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আগের যুগের রেকর্ডিং প্রযুক্তি, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ও পরিবেশনার ধরনও বর্তমান সময়ের শ্রোতার অভ্যাস থেকে অনেকটাই আলাদা। নতুন করে রেকর্ড করার ফলে গানগুলো ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ, প্রচার ও নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ হয়। তবে সেই প্রক্রিয়ায় মূল সুর, কথা ও গানের স্বাতন্ত্র্য কতটা অক্ষুণ্ন থাকছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
রিমেক আর নকল এক বিষয় নয়। একটি পুরোনো গান নতুনভাবে পরিবেশনের ক্ষেত্রে মূল স্রষ্টার কাজের প্রতি সম্মান, প্রয়োজনীয় অনুমতি এবং সৃষ্টিশীল পুনর্বিন্যাস থাকা জরুরি। নকীব খানের সুর করা রেনেসাঁর ‘হৃদয় কাদা মাটির কোনো মূর্তি নয়’ গানটি তরুণ শিল্পীদের কণ্ঠে নতুনভাবে পরিবেশনের ক্ষেত্রে মূল স্রষ্টার অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। আবার ২০২৬ সালে রেনেসাঁর ‘আজ যে শিশু’ নতুনভাবে পরিবেশন করেন নকীব খান, পার্থ বড়ুয়া ও বাপ্পা মজুমদার। বাপ্পা মজুমদারের বক্তব্যেও উঠে এসেছে পুরোনো গানের দীর্ঘস্থায়ী আবেদনের বিষয়টি। তাঁর মতে, কিছু গান সময় পেরিয়েও মানুষের কাছে আবেদন ধরে রাখে; নতুন পরিবেশনার লক্ষ্য সেই আবেদন নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া।
রিমেকের জনপ্রিয়তার পেছনে বাজারের বাস্তবতাও রয়েছে। নতুন একটি গান শ্রোতার কাছে পরিচিত করতে প্রচারণা, সময় ও নানা ধরনের পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। বিপরীতে আগে থেকেই জনপ্রিয় কোনো গান প্রকাশের শুরুতেই মানুষের কৌতূহল তৈরি করতে পারে। পরিচিত সুর ও কথার কারণে শ্রোতা দ্রুত গানের সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত হন। ফলে নির্মাতা ও প্রযোজকদের কাছে রিমেক অনেক সময় তুলনামূলক কম ঝুঁকির প্রকল্প হয়ে ওঠে।
সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীর বক্তব্যে এই প্রবণতার আরেকটি দিক উঠে এসেছে। তাঁর মতে, নস্টালজিয়া এখন শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতির বিষয় নয়; বিনোদন শিল্পে এটি বিপণনের একটি কার্যকর উপাদানও হয়ে উঠেছে। পুরোনো গান শুনলে শ্রোতার মনে নির্দিষ্ট সময়, মানুষ ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ফিরে আসে। সেই আবেগের সঙ্গে নতুন সংগীতায়োজন যুক্ত হলে গানটি সহজেই মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।
অন্যদিকে কণ্ঠশিল্পী ধ্রুব গুহ রিমেককে গান সংরক্ষণের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। তবে তাঁর সতর্কতার জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ—নতুন সংস্করণ তৈরির সময় যেন মূল শিল্পীর স্বকীয়তা কিংবা গানের মান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কারণ একটি গান কেবল কথা ও সুরের কারণে জনপ্রিয় হয় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নির্দিষ্ট সময়ের সাংস্কৃতিক আবহ, শিল্পীর কণ্ঠ, পরিবেশনা এবং শ্রোতার ব্যক্তিগত স্মৃতি।
তাই বাংলাদেশের সংগীতে রিমেকের বিস্তারকে এককথায় সৃষ্টিশীলতার সংকট বলা যায় না। আবার প্রতিটি রিমেককে নতুনত্বের নিদর্শন হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না। কোনো কোনো উদ্যোগ অতীতের মূল্যবান গানকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আন্তরিক চেষ্টা। আবার কোথাও পরিচিত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে দ্রুত শ্রোতা পাওয়ার বাণিজ্যিক কৌশলও স্পষ্ট।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—পুরোনো গান নতুনভাবে পরিবেশনের পাশাপাশি আজকের শিল্পীরা কতটা নতুন গান তৈরি করছেন। একটি সংগীতভুবন কেবল অতীতের জনপ্রিয় গান পুনরায় পরিবেশন করে দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধ হতে পারে না। বর্তমান সময়ের অভিজ্ঞতা, ভাষা, সামাজিক বাস্তবতা ও মানুষের নতুন অনুভূতি থেকে নতুন গান তৈরি করাও সমান জরুরি। কারণ আজ শক্তিশালী নতুন গান তৈরি না হলে আগামী প্রজন্মের হাতে ভবিষ্যতে পুনঃপরিবেশনের মতো নতুন ঐতিহ্যই থাকবে না।
ভালো রিমেক তাই অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি সেতু তৈরি করতে পারে। সেখানে পুরোনো গানের আবেগ থাকে, কিন্তু পরিবেশনায় যোগ হয় নতুন সময়ের স্পর্শ। আর দুর্বল রিমেক কেবল পুরোনো জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝা এবং এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করা, যেখানে সংগীতের ঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে, স্রষ্টার অধিকার ও স্বকীয়তা সম্মান পাবে এবং একই সঙ্গে নতুন সৃষ্টির পথও উন্মুক্ত থাকবে।
মন্তব্য