সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই আগস্ট ২০২৬, ৬:১৯ পিএম

বাংলাদেশের জনপ্রিয় রকশিল্পী মাহফুজ আনাম জেমস ও তাঁর ব্যান্ড ‘নগরবাউল’-এর বিরুদ্ধে ইতালির রোমে ৩৫ হাজার ইউরো প্রতারণার অভিযোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪৬ লাখ টাকা। রোম ও ভেনিসে দুটি সংগীতানুষ্ঠান আয়োজনকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেন ও অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে বিরোধের জেরে স্থানীয় পুলিশের কাছে এই অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগকারী আবুল মোয়াজ স্থানীয় পুলিশের কাছে ১৭ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত নথি জমা দিয়েছেন। শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬ স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ২০ মিনিটে রোমের ‘লেজিওনে কারাবিনিয়েরি লাজিও’ পুলিশ স্টেশনে তিনি অভিযোগটি দায়ের করেন।
অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, রোম ও ভেনিসে দুটি সংগীতানুষ্ঠান আয়োজনের উদ্দেশ্যে জেমস ও তাঁর দলের সঙ্গে মোট ৩৫ হাজার ইউরোর আর্থিক লেনদেন হয়েছিল। অভিযোগকারীর দাবি, নির্ধারিত দুটি অনুষ্ঠানের মধ্যে জেমস কেবল রোমের অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ভেনিসের অনুষ্ঠানটি তাঁর দলের মাধ্যমে নির্ধারিতভাবে সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়টি আরও জটিল হয় যখন অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী, ভেনিসের অনুষ্ঠান পরবর্তী সময়ে একই শিল্পী বা দলকে ঘিরে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে আয়োজন করা হয়। এর ফলে আগে পরিশোধ করা অর্থের বিনিময়ে কী ধরনের সেবা দেওয়ার কথা ছিল, চুক্তির শর্ত কী ছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব কে পালন করেছে—এসব প্রশ্ন সামনে আসে। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই আবুল মোয়াজ আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ তুলে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন।
তবে অভিযোগ দায়ের হওয়াকে প্রতারণার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাধারণত অভিযোগের নথি, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, চুক্তি বা সমঝোতার শর্ত, অনুষ্ঠান আয়োজনের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পর্যালোচনা করে থাকে। তদন্তে অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, তার ওপরই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ভর করবে।
এখন পর্যন্ত জেমস কিংবা ‘নগরবাউল’-এর পক্ষ থেকে ৩৫ হাজার ইউরোর অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দলের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত রুবাইয়াৎ ঠাকুরের বক্তব্যও অভিযোগপত্রে উল্লেখ নেই। ফলে ভেনিসের অনুষ্ঠান সম্পর্কে জেমসের দল কী ব্যাখ্যা দেয় এবং দুই পক্ষের মধ্যে কী ধরনের চুক্তি হয়েছিল, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জেমসের ইতালি সফরকে ঘিরে এর আগে আরেকটি পৃথক বিরোধের কথাও সামনে এসেছে। রোমের একটি হোটেল কর্তৃপক্ষ দলের জন্য বরাদ্দ করা চারটি অ্যাপার্টমেন্টের পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবহারের অবস্থা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। ১৯ আগস্ট আয়োজক আবুল মোয়াজকে পাঠানো এক ই-মেইলে হোটেল কর্তৃপক্ষ দাবি করে, কক্ষগুলো অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় পাওয়া যায়। বিশেষ করে ৫৪৯ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টের অবস্থা নিয়ে তাদের আপত্তি ছিল বেশি।
হোটেল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ওই কক্ষ পরিষ্কার করতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত শ্রম ও সময় প্রয়োজন হয়। এ কারণে তাদের নিয়ম অনুযায়ী ২০০ ইউরো জরিমানার কথাও জানানো হয়। পাশাপাশি অতিথিরা রিসেপশনে যোগাযোগ না করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে চেক-আউটের প্রক্রিয়া শেষ না করেই হোটেল ছেড়ে গেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছিল।
তবে হোটেলের বক্তব্যের কিছু অংশ অস্বীকার করেছে জেমসের ব্যবস্থাপনা পক্ষ। রুবাইয়াৎ ঠাকুরের দাবি, দলের সদস্যরা চারটি পৃথক কক্ষে অবস্থান করছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জেমস ছিলেন ৩৪৫ নম্বর কক্ষে এবং তিনি ছিলেন ২৪৬ নম্বর কক্ষে। ৫৪৯ নম্বর কক্ষে ছিলেন একজন সংগীতশিল্পী। সেখানে সামান্য অপরিচ্ছন্নতার বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ তৈরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
চেক-আউট না করে হোটেল ত্যাগের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন রুবাইয়াৎ ঠাকুর। তাঁর বক্তব্য, ইতালিতে দলের সদস্যদের পাসপোর্ট জমা থাকার কারণে নিয়ম এড়িয়ে হোটেল ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। দলের সদস্যরা চাবি বুঝিয়ে দিয়ে স্বাভাবিক নিয়মেই হোটেল ত্যাগ করেছেন বলেও তিনি দাবি করেছেন।
দুটি ঘটনাই একই ইতালি সফরকে কেন্দ্র করে সামনে এলেও তাদের প্রকৃতি আলাদা। হোটেল-সংক্রান্ত বিরোধটি মূলত কক্ষের পরিচ্ছন্নতা, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি, অতিরিক্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার খরচ এবং চেক-আউটের নিয়ম নিয়ে। অন্যদিকে ৩৫ হাজার ইউরোর অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন, অর্থ প্রদান এবং নির্ধারিত সেবা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়।
পুলিশি তদন্তে তাই রোম ও ভেনিসের অনুষ্ঠান আয়োজনের লিখিত চুক্তি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে ৩৫ হাজার ইউরো কীভাবে ও কাকে দেওয়া হয়েছিল, অর্থ প্রদানের শর্ত কী ছিল, দুটি অনুষ্ঠানের দায়িত্ব কোন পক্ষ নিয়েছিল এবং ভেনিসের অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত কার মাধ্যমে আয়োজন করা হয়—এসব তথ্য যাচাই করা হতে পারে।
দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া বার্তা, ই-মেইল, অর্থ লেনদেনের নথি, অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও তদন্তের অংশ হতে পারে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আয়োজক, শিল্পী, ব্যবস্থাপনা প্রতিনিধি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য নেওয়া হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমানে ঘটনাটি অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে। অভিযোগ দায়ের হয়েছে মানেই জেমস বা তাঁর ব্যান্ড প্রতারণার ঘটনায় দোষী—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তদন্তে প্রমাণ কী পাওয়া যায় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কী ব্যাখ্যা দেয়, তার ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে।
জেমসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এলে ভেনিসের অনুষ্ঠান, অর্থ লেনদেন এবং চুক্তির শর্ত নিয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ইতালীয় কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপও নির্ধারণ করবে, বিষয়টি নিছক আর্থিক বা চুক্তিগত বিরোধ হিসেবে থাকবে, নাকি এর সঙ্গে কোনো ফৌজদারি আইনি কার্যক্রম যুক্ত হবে।
মন্তব্য